Home সাক্ষাৎকার কবিতা মানসিক কর্ষণের ফসল

কবিতা মানসিক কর্ষণের ফসল

কবিতা মানসিক কর্ষণের ফসল
112
0

কৌস্তভমণি শইকীয়া জন্ম ১৯৫৬ সালে, আসামের গোলাঘাটে। অসমিয়া ভাষা-সাহিত্য এবং সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। এই কবি অসমিয়া কবিতার ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি কবিতা লেখার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস এবং শিশু সাহিত্যেও তার নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি অল ইণ্ডিয়া রেডিওর একজন স্বীকৃত গীতিকার। কিংবদন্তির, হয়ে এই সব্যসাচী লেখক কৌস্তভমণি শইকীয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনুবাদক বাসুদেব দাস।

বাসুদেব: আপনার শৈশবের পরিবেশ এবং পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন।

কৌস্তভমণি:  উজান অসমের গোলাঘাট জেলার কমারবন্ধা অঞ্চলে উনিশ শো ছাপান্ন সালের পাঁচ সেপ্টেম্বর আমার জন্ম হয়। বাবা রত্ন শইকীয়া এবং মা সুবর্ণবালা শইকীয়া। দুজনেই প্রয়াত।বাবা কমারবন্ধা হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন।কমারবন্ধা হাইস্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করে কটন মহাবিদ্যালয় থেকে প্রাক বিশ্ববিদ্যালয় (বিজ্ঞান) গোলাঘাট দেবরাজ রয় মহাবিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক অসমিয়ায় স্নাতক এবং গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্য এবং ভাষাতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করি। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় ডিগ্রি অর্জন করি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়  ‘মোহ’ নামে একটি কবিতা দিয়ে আমার সাহিত্য জীবনের সূত্রপাত হয়।আমার জন্মস্থান কমারবন্ধা একটি ছোট জায়গা। কমারবন্ধা আলি রেলস্টেশন, ধোদর আলি, দুটি হাইস্কুল, কয়েকটি দোকানপাট, দুর্গাপুজো হয়, পাশের দুটো নামঘরে মাঝে মধ্যে ভাওনা হয়।

তিনঘর মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী আড়ম্বর সহকারে দেওয়ালির আয়োজন করে জয়হিন্দ ক্লাব এবং গ্রন্থাগারের সদস্যরা দুর্গাপুজো, দেওয়ালির সময় নাটক করে, ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেটের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। অভিনয়ে অংশ নিয়ে সেই শৈশব থেকে ছোট চরিত্রে অভিনয় করে পরবর্তীকালে বিশেষ চরিত্রেও অভিনয় করেছিলাম। চাষ-বাসের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে মাঠে ঘাটে গিয়েছি। কাকডোঙ্গা নদী এবং বাড়ির পুকুরে সাঁতার কেটেছি। মাঠে গরু চড়িয়েছি। জন জীবন এবং প্রাকৃটতিক পরিবেশের সঙ্গে গড়ে উঠা সম্পর্ক আমার চালিকা শক্তি। বাবা রত্ন শইকীয়া একজন সাহিত্য রসিক ব্যক্তি ছিলেন।

বাসুদেব: আপনি যখন লিখতে শুরু করেছিলেন এবং আজকের যে সামাজিক পরিবেশ এর মধ্যে অসমিয়া কবিতার কোনো উত্তরণ ঘটেছে কি?

কৌস্তভমণি: সত্তরের দশকে আমি কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছিলাম। এই সময়ে কবিতাকে দুর্বোধ্যতার কাঠগড়া থেকে বের করে এনে জনমানসের কাছে পৌছে দেবার একটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। প্রায় কবিতাতেই মানুষের জীবন উত্থানের একটা প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। এখন উত্তর আধুনিকতার বাতাস লেগে কবিতার রঙ-রূপ পালটে গেছে। একে নিশ্চয় সাদরে বরণ করে নিতে হবে। সাহিত্য সমীক্ষকের দৃষ্টিতে ভবিষ্যতে এর সঠিক মূল্যায়ন হবে।

বাসুদেব: অসমিয়া সাহিত্যের কোনো কবির কবিতা আপনাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে কি?

কৌস্তভমণি: সেভাবে ব্যক্তিবিশেষের কোনো কবিতা আমাকে প্রভাবিত করেনি। কয়েকজন অগ্রজ কবির কবিতার দ্বারা আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। শঙ্কর-মাধবদেবের দ্বারা, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা, চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, কেশব মহন্ত, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত আদি কবির দ্বারা অনুপ্রাণিত।

শঙ্কর-মাধবদেবের দ্বারা, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা, চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, কেশব মহন্ত, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত আদি কবির দ্বারা অনুপ্রাণিত।

বাসুদেব: অসমিয়া কবিতার সাম্প্রতিক অবস্থান সম্পর্কে কিছু বলুন।

কৌস্তভমণি: সাম্প্রতিক অসমিয়া কবিতা বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে একাসনে বসার পর্যায়ে এসে পৌছেছে। বিষয় নির্বাচন, রচনা কৌশল, ভাবের গভীরতা, নির্মাণ চাতুর্য আদি প্রতিটি গুণই সাম্প্রতিক কবিতায় পরিলক্ষিত হয়।

বাসুদেব: কবিতা লিখে জীবন ধারণ করা সম্ভব কি?অসমিয়া কবিতা জীবিকার অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে কি?

কৌস্তভমণি: বর্তমান সময়ে কবিতা লিখে অর্থ উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করার পরিবেশ এসেছে বলে আমি মনে করি না।

বাসুদেব: কবিতা লেখার জন্য কোনো অলৌলিক প্রেরণা অনুভব করেন কি?

কৌস্তভমণি: কবিতা মানসিক কর্ষণের ফসল। অলৌকিক প্রেরণা কবিতা সৃষ্টিতে সাহায্য করে বলে আমি মনে করি না।

বাসুদেব: সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আজকের দিনে কবিতার কোনো ভূমিকা থাকতে পারে কি?

কৌস্তভমণি: কবিতা সোজাসুজি নিশ্চয় সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের জন্য দায়বদ্ধ কবিতা একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে চালিকা শক্তির কাজ করতে পারে।

বাসুদেব: কবির কবিতা দেশকালের দ্বারা সীমাবদ্ধ কি?

কৌস্তভমণি: অনুবাদের মাধ্যমে কবিতা বিশ্বমানসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গোলকীকরণ আজ সমগ্র বিশ্বকে ঘরের কাছে নিয়ে এসেছে। কবিতা ভাষার বাধাকে অতিক্রম করে বিশ্বমানবের মনের দিগন্তে প্রবেশ করেছে।

অনুবাদের মাধ্যমে কবিতা বিশ্বমানসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গোলকীকরণ আজ সমগ্র বিশ্বকে ঘরের কাছে নিয়ে এসেছে। কবিতা ভাষার বাধাকে অতিক্রম করে বিশ্বমানবের মনের দিগন্তে প্রবেশ করেছে।

বাসুদেব: আপনি মূলত একজন কবি, কবিতা ছাড়াও আপনার একাধিক গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস এবং শিশুতোষ উপন্যাস আছে। এর বাইরেও আপনি আকাশবাণী স্বীকৃত একজন বিখ্যাত গীতিকার। সাহিত্য সংস্কৃতির এতগুলি ক্ষেত্রে আপনি সফলতার সঙ্গে পদচারণা করে চলেছেন। এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে?

কৌস্তভমণি: কাব্যচর্চার সঙ্গে আমি সাহিত্যের অন্য কয়েকটি বিভাগেও সাধ্য অনুসারে চর্চা চালিয়ে যেতে চেষ্টা করছি। এটা একান্ত ভাবেই মানসিক তাগিদায়। কবিতায় যা প্রকাশ করতে পারিনা তা কখনও গল্প উপন্যাসে, কখনও ব্যঙ্গ রচনায়, কখনও গীতি নাটকের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করি।

বাসুদেব: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

কৌস্তভমণি: ধন্যবাদ।

(112)

বাসুদেব দাস ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
তার শৈশব কেটেছে গুয়াহাটি শহরে।
১৯৮২ সনে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন।
তিনি একজন নিয়মিত অসমিয়া সাহিত্যের অনুবাদক।
NEINAD এর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা- সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership দ্বারা তাকে সম্মানিত করা হয়।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯ টি।