Home কবিতা তবু তারে পাখির মতো লাগে

তবু তারে পাখির মতো লাগে

তবু তারে পাখির মতো লাগে
51
0

নকশী-কাঁথা

এক বিকেল গাঁদা ফুলের আলোয়
আমার মা বসে আঁকছেন নকশী-কাঁথা।

কাঁথার জমিন ভরে মা অজস্র মাছ আঁকছেন।
থৈ থৈ জল আঁকছেন। কী নিপুণ
এঁকে যাচ্ছেন অসংখ্য লতা-পাতা,
অপূর্ব শাপলা-শালুক—
সুঁইসুতাজলে, লতা-পাতা ও শালুকের ভেতর দিয়ে
রঙিন মাছেরা সব কী মধুর কাটছে সাঁতার!

অথচ আমার মা,
জলহীন ডাঙ্গায় খোলের ভেতর তড়পাচ্ছেন; ৪৩ বছর
যদিও পাশেই তার ভালোবাসার নদী, বিল ও পুকুর—
একদা জলেই যার কেটেছে সারাবেলা,
এখন সে এক সাঁতার ভোলা মাছ!

সে খুব দুর্যোগের কাল—দুর্ভাগ্য ছিলো ওত পেতে
ফ্রক-পরুয়া আমার বালিকা মা বিয়ে-বড়শিতে
ধরা খেলেন মাওলানা বাবার হাতে—
আর তাতেই বন্ধ হয়ে গেলো আহা! সেই
প্রেমিক জলের সাথে প্রিয় যোগাযোগ!

মা এখন বটিতে কেটে নিজের রুপালি জীবন
চ্যাতা কড়াইয়ে ভেজে চলেছেন প্রতিদিন
আর গরম গরম তুলে দিচ্ছেন আমাদের পাতে!


অলকানন্দা

১.
পাখি নয়—তবু তারে পাখির মতো লাগে

হলুদ সে সুন্দরী
হলদে রোদের সাথে খেলে
খুনসুটি

সবুজ বাকল বেয়ে নামে ঘামের দরদর

২.
মাইকের মতো সুতীব্র শরীর
কেবল বেজেই চলে—

ঠোঁটে তার ফুঁ দিয়ে পুরবী গায় পোকা

৩.
যেখানে বুকের কাছে খোলা
অলিন্দ মেলে আছে
তার পাশেই ফুটেছে সে বিহŸলতা—
বলে চলি প্রণয় কথা—
যার পাতা কাঁথার ন্যায় সেলাই হয়ে আছে;

হাওয়ার খোঁচায় নেচে ওঠে সুন্দরী বালা

৪.
এ তবে দুপুর!
ভেবেছি নিদান কাল!

জ্বলন্ত চিতার মতো রোদ
জ্যান্ত পুড়ছি—পুড়ে গেছে জগতের ভোর
হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত—তৃষ্ণার্ত হয়েছি
বাঘ ও কুমিরের সাথে
এক ঘাটে পান করেছি জল—
বহু ছায়ার তলে দাঁড়িয়ে দেখেছি যত বিফলতা
বহু পথের গল্প পায়ে নিয়ে চলেছি একা;
অবসাদে হারিয়ে হৃদয় ও চোখের পাতা—

দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে যে ফুলের কাছে চেয়েছি বিশ্রাম।


কামরুন্নিছা

সিঁথি জুড়ে হাসে তার সিঁদুরের লাল
জ্বলছে মাথায় য্যানো শীতল আগুন
সেই তাপে পুড়ে যাবে পুরুষ ফাগুন
পীত রঙা হাসি তার ঠোঁটে মহাঝাল—

মরে যাবো, বাঁচিব না, ডাকে পরকাল!

মুসলমানের বেটি পরেছো সিঁদুর
যদিও লেখা নেই ধর্মের নাম;
রাঙাভায় লাগে মুখ আহা কি মেদুর
সূর্যের সিঁথিতেও সিঁদুর দেখিলাম!
চুল থেকে টপটপ স্নানধোয়া জল
গড়ি গড়ি নেমে যায় কোন মহাতল
মহাতলে যেতে লাগে কতগুলো পাত—
কচুর ডগার মতো মোলায়েম হাত

ধরে আছি, পরাণেতে বড় বিহŸল!

অন্তরবাসহীন একপেচে শাড়ি
পরে আছে; কোটি জুড়ে রুপার বিছা
ভ্রমরের চোখ হতে কাজল কাড়ি
চোখ তার এঁকেছে সে, কামরুন্নিছা—
সুতির মেঘের তলে পিতলের চাঁদ
দুলে ওঠে টলমল লাগে বরবাদ—
বরবাদ লাগে আর খোদারে ডাকি
—হে তুমি বাঁচিয়ে দাও প্রাণের পাখি

শ্যামাঙ্গী ক্ষেতে সোনা করবো আবাদ!

আলতার রক্তে সাজিয়েলো পা
হেঁটে গেলো দুলে দুলে ছড়িয়ে খোঁপা
খোলা পিঠ য্যানো দেখি প্রচুর সকাল
নিতম্বের ঢেউ লেগে নাচে মহাকাল—

মরে যাবো, বাঁচিব না, ডাকে পরকাল!

পরকাল ডাকে আর আমি যাই পুড়ে
পুড়ে পুড়ে লোহারূপ হয়ে আছি লাল
ঢেলে দাও শীত-জল এই বুক জুড়ে
বধূ ওগো গেলে দাও যাতনার কাল—

মরে যাবো, বাঁচিবো না, ডাকে পরকাল!


বিভ্রম

ইদানীং এমন হয়েছে—
কাউকে আদর ক’রে পরক্ষণেই ভুলে যাচ্ছি তার নাম,
গোলাপকে কথা দিয়ে চলে যাচ্ছি রডোডেনড্রন

ইদানীং এমন হয়েছে—
কাউকে ভালোবাসতে গিয়ে তাকে হত্যা করছি,
ফুল দিতে গিয়ে ঘৃণা ছুড়ে মারছি প্রেমিকার মুখে

ইদানীং এমন হয়েছে—
মসজিদে যাবো বলে চলে যাচ্ছি প্রসিদ্ধ ব্রোথেল,
পবিত্র হতে গিয়ে অশুচির গলা-পুকুরে ব্যস্ত সন্তরণ

ইদানীং হয়েছে এমন—
আমি কাঁদতে গিয়ে হো হো ক’রে হেসে উঠছি, আর
হাসতে গিয়ে ফেলছি কেঁদে—
শুনেছি হাসিতে আয়ু বাড়ে, অথচ কবেই মৃত্যুর কাছে
বন্ধক রেখেছি জীবন

ইদানীং হয়েছে এমন—
আমি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ছি মাঝ রাস্তায়,
বাড়ির ঠিকানা ভুলে—
প্রত্যুষ ফেলে ভুল টানেল ধরে ভুল গিয়ারে
ঢুকে পড়ছি জন্মান্ধ রাত্রি-নিকেতন

ইদানীং বারংবার বিভ্রমে ছিনালকে মা ডেকে ফেলছি;
পথে একজন জিজ্ঞেস করেছিলো
বাবার নাম— বলতে পারি নি!


ঘুম

একটি মৃত কুকুর পড়ে আছে রাস্তায়
শান্ত, নিরুৎসাহিত, কামনাহীন চোখ
পৃথিবীর প্রতি মারাত্মক অরুচি নিয়ে
শুয়ে আছে— নিশ্চিন্ত— ধুলোর ভেতর

দেখে মায়া হয়—

ইচ্ছে করে,
তার পাশে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ি
জড়ায় ধরি—
আমিও সেই রকম পড়ি ঘুমায়!

(51)

নোমান নজরবী জন্ম: ৫ নভেম্বর ১৯৮৮, রাজবাড়ী।
প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: শরমবাহার (বইমেলা ২০২০, পেন্ডুলাম পাবলিশার্স), প্রিয় রাজহাঁস (নভেম্বর ২০২০, অনুপ্রাণন প্রকাশন)।