Home গদ্য দ্যা রুট
দ্যা রুট

দ্যা রুট

110
0

‘আমার অতীতটা খুব সুখকর ছিলনা, বলতে গেলে ঝড়ো আর বিশ্রি রকমের যন্ত্রণাদায়ক’নাবিলার হাতে হাতটা রেখে রবিন বলল।

‘হু আমারও। নিত্য অভাব অনটন পারিবারিক সুখকে ম্লান করে দিয়েছিল ।চোখ বন্ধ করলে ক্ষীণদেহী মা, আর কপালে দীর্ঘ ভারী ভাজ পড়া বাবাকে দেখি’ রবিনের হাতের উষ্ণতা অনুভব করতে করতে উত্তর দিল নাবিলা।

লঞ্চ ছাড়ার পর ওরা কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে।বাজার বারে ঘাটে প্রচুর নৌকা, ট্রলার, কার্গো বিভিন্ন নাম আর সাইজের । ফেরিতেও পারাপার হচ্ছে লোকজন । লঞ্চ এগিয়ে যাচ্ছে দু’পারের গ্রামকে পিছনে ঠেলে। ছবির মতো ঘাটের দৃশ্যটা মিলিয়ে যাচ্ছে । ক্রমশঃ আরো নতুন নতুন দৃশ্যে ওরা আরো মোহাচ্ছন্ন হতে থাকে।

‘অতীতটা হল পুরোনো জীবন্ত ছবি, স্মৃতি হাতরিয়ে মানুষ পুরোনো ছবিগুলি দেখে; পুরোনো সম্পর্ক, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভুল থেকে সৃষ্ট হতাশা-দীর্ঘশ্বাস,কিছু সোনালী সময়ও হয়তো থাকে সেখানে।মানুষ অতীত হাতরায়, কারন মানুষের বর্তমানটা অতীতে প্রোথিত থাকে।’ একটা ভেঙ্গে পড়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে  রবিন বলল।

‘তিন বোনের মধ্য আমিই বড়’ – নাবিলা অতীত নিয়ে কিছু বলতে শুরু করল। ‘বাবা গুদামে কাজ করতেন । ঠিকমত খাওয়া পড়া জুটতোনা, খাবার যোগাড়ে আমরাও এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়তাম । জঙ্গলে ঢুকে বুনো ফল খেতাম । আমাদের বাড়িটা ছিল বাজারের কাছাকাছি সেখানে – ব্যাপারিদের নৌকা ভিড়তো। চোখে পড়ার মতো বড় হয়েছি সবে, গায়ের উঠতি ছেলে-ছোকরা, বিবাহিত লোক, এমনকি দূরের বাজারে ব্যবসা করতে যেতো-আসতো যেসব লোকজন , ওদের সাথে আমার শারীরিক সম্পর্ক হতে থাকল-এটা ওটার বিনিময়ে।

ক্রমশ একটা নিয়ন্ত্রণহীন জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। ওদের পোষাচ্ছিল না হয়তো, একদিন ওপারের, মানে ইন্ডিয়ান দালালের কাছে বিক্রি হয়ে গেলাম। নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন জীবনের সাথে মানিয়ে নেয়ার বাধ্যবাধকতা, বন্ধীত্ব, মানাতে না পারার নির্যাতন-এভাবেই চলছিল ক’বছর। খুব মনে পড়তো;মা-বাবাকে, বোনদেরকে, নিজের মুক্ত জীবনকে। আমি ওখান থেকে বের হবার রাস্তা খুঁজতে লাগলাম।’

তারপর?

‘কয়েক হাত বদলের পর পরিচয় হল চোরা কারবারীদের একজনের সঙ্গে, তার হাত ধরেই এপাড়ে ফিরলাম। যে এখন এখানকার বস। তারপর অন্য এক জীবন এ জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেবার যুদ্ধ। যে নাবিলাকে দেখছ, সে নাবিলা তৈরী হবার জন্য কঠিন প্রস্তুতি নেয়ার দরকার ছিল, জানইতো সব ।’ নাবিলা উত্তর দিল।

‘পরিবারের কাছে ফিরে যাওনি?’

‘যখন খুঁজতে বেরিয়েছি, ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। বাড়ির চিহ্নটাও ছিলনা। খুঁজে  পেলেও ফেরা হতো কিনা, কোম্পানি আর বস দু’জায়গায় এমনভাবে জড়িয়ে গেলাম !’ চোখের সামনে ইটখলার উচু চিমনির কালো ধোঁয়া, কাঁচা পাকা ইটের সারি,  এমনকি পাঁজার দগদগে আগুনকে উপলব্ধি করলো নাবিলা। রবিন গভীর সহানুভূতির সাথে হাতটা ওর কাঁধে রেখে নিজের অতীত সম্পর্কেও কিছু বলতে লাগল-

‘তাহলে শোন, আমার দাদা -দাদী (বাবার পালক বাবা মা)ছিল খুবই নির্দয় আর নিষ্ঠুর প্রকৃতির। বাবার অনুপস্থিতিতে মাকে পুড়িয়ে মেরে, আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছিল। ক’মাস পর বোনটাও রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ। আমাকে নিয়মিত স্কুলে যেতে হতোনা, গরু-রাখালি, গোয়াল পরিস্কার করা, ফাই-ফরমাস খাটিয়ে খরচটা পুষিয়ে নিতো। খুব দুরন্ত ছিলাম বলে প্রায়ই হাত পা বেঁধে গোয়ালে ফেলে রাখতো। বাবার অলসতা আর ঘর পালানোর স্বভাব ছিল, কোথায় না কোথায় হারিয়ে যেতো । একদিন এসে আমার দুরাবস্থা দেখে এতিম খানায় রেখে এল।’

‘তুমি এতিমখানায় ছিলে!’ অবাক না হয়েই নাবিলা বলল।

‘হ্যাঁ কিছুদিন। সুপারিনটেনডেন্ট এর বকাঝকা, বলৎকার, খাবার কেড়ে নেওয়া কী ছিলনা সেখানে?’

‘তারপর ওখান থেকে পালিয়েছ, তাইনা ?’

‘তুমি আমার প্রোফাইল দেখেছ?’

‘না, আমাদের সবার প্রোফাইল তো প্রায় একই ।’

‘আর আমাদের পেছনের গল্পটাও। ’রবিন বলল। ‘কম বয়সি একজন শিক্ষককে খুন করে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছিলাম। বলতে গেলে সেই হাতেখড়ি।’

‘মানে যিনি তোমাকে পড়াতেন? নিজের গুরুজীকে? ’ নাবিলা জিজ্ঞেস করলো।

‘হ্যাঁ, গুরুজী কী বলছো? শিক্ষকের কোন গুন লোকটার মধ্য ছিলনা, যেমন ছিল গ্রামের আহমেদ স্যারের মধ্য-সকাল সন্ধ্যা সেজদা দেওয়া যায় যে গুরুজীকে।যা বলছিলাম-শালা একটা হোমো, আমার মাথা গুজার ঠাঁই টুকুর প্রতিটি রাত বিশ্রি রকমের যন্ত্রণাদায়ক করে তুলেছিল।’

তারপর ?

‘তার আর পর কী?চলতে চলতে এই ঘাটে সখী!’

সাইরেনের বেসুরা চিৎকারে, অতীত রোমন্থন ছেড়ে সতর্ক হল ওরা। লঞ্চ ঘাটে ভিড়ছে ।ঘাটের পাশেই রাজারপুর স,মিল । রাজারপুর ঘাট । ঘাট মানেই কম বেশী ভীড়, যাত্রীর উঠানামা । দুই জন নেমেছে, আট জন উঠেছে-সাধারণ যাত্রী বাচ্চা কাচ্চা-ব্যাগ –পুটলি।‘না, সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি’ অনেকটাই নিশ্চিত হল তারা ।

জিরো টলারেন্স পরিস্থিতিতে কোম্পানির নিয়মিত রুট আর নিরাপদ নয়। কোম্পানির কাজে নতুন রুটে যাচ্ছে তারা। নদীপথে সুনামগঞ্জ হয়ে সিলেট। নাবিলা আর রবিন যথারীতি নতুন রুট সম্পর্কে রিপোর্ট করবে। সেইফ এন্ড রিচ্ মনে হলে এটা কোম্পানির নিয়মিত রুট হবে ।দেশ ও সমাজের স্বার্থবিরোধী পণ্য  আসবে–যাবে। খুবই সিক্রেট আর ইমপোর্টেন্ট । কাজে গুরুত্বহীন হওয়ার মানে নিজের খতমনামায় নিজে সই করা-এটাই কোম্পানির নিয়ম।

অ্যা–ই… বা-দা-ম ….। সবশেষে উঠল একজন বাদামওয়ালা। লঞ্চের সংক্ষিপ্ত সিড়ি বেয়ে উপর তলায় ওঠে আসল লোকটা । বাদাম ওয়ালার দৃষ্টি চেনার চেষ্টা করল রবিন ।

এদিক ওদিক তাকিয়ে লোকটা শেষ পর্যন্ত ওদেরকেই দেখছে। তারা বাদাম কিনবে এই আশায়? সাধারণ কৌতুহল? নাকি নিরীক্ষা করছে, কে জানে! পুলিশের সোর্স নয়তো? লোকটাকে পুলিশি ছাঁছে ফেলে দেখল রবিন । অন্য সময় হলে এই ছোট ব্যাপারটা আমলে নেয়ার দরকার ছিলনা । চট করে তো আর খাঁচায় ঢুকাতো না ! ইন্ফরমেশন  যোগাড় আর দায়িত্ব হস্তান্তর হতো। বাদামওলায়া–ফুচকাওয়ালা–ওয়াকিটাকিওয়ালা, প্রয়োজনে উপরওয়ালা। ইনভেস্টিগেশন শেষে বড়জোর ফাইল ওপেন হতো। কিন্তু জিরো টলারেন্স পরিস্থিতি ভিন্ন । মৃত্যুদূতের মতো পিছনে ছুটছে ক্রসফায়ার আতঙ্ক। যে কোন সময় যে কোন কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা। তারপর কোম্পানির সিল মারা বেওয়ারিশ রবিনের লাসটা শেয়াল কুকুর ছিঁড়বে, পুলিশের খরচের খাতায় নাম উঠবে-এইতো?

পরের ঘাটে বাদামওয়ালা নেমে গেল,সাময়িক স্বস্তি পেলেও আবার সেই চিৎকার চেঁচামেচি যাত্রির উঠানামা……

‘চল কেবিনে গিয়ে বসি। ’রবিন বলল।‘এমন অনিরাপদ উৎকন্ঠা আজ আর ভাল লাগছেনা।’

রবিনের অবস্থা বিবেচনায় নিদারুন এক যন্ত্রণার হাসি পায় নাবিলার।দেশে- বিদেশে বহুবার এমন হয়েছে।পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ওদের আছে।কিন্তু আজ এই রুটে এসে দুজনেরেই স্মৃতিকাতর হয়ে আছে মনটা।নদীর দুপাশের গ্রামীণ সরল জীবনের মোহ যেন তাদরে আচ্ছন্ন করে আছে।নিষ্ঠুরতার থাপ্পরে যে জীবন তাদের হারিয়ে গেছে অনেক আগেই।

‘জানো, মাঝে মাঝে মনে হয়,চলতে চলতে মা-বাবা আর বোনদের দেখা পেয়ে যাই।’

‘জীবনটাকে তোমার সিনেমার মতো মনে হয়! বাস্তব জীবন আরো আলাদা।তা, ওদের আর খোঁজ করনি কেন?’

‘পেশাগত কারনেই ওখানের কারো সাথেই আর যোগাযোগ হয়নি, তাহলে কোথায় খুঁজবো?বলতো কবে, কখন, প্রতিদিনের উৎকন্ঠা আর মৃত্যুভয় বুকে নিয়ে ওল্কার মতো ছুটছি না আমরা?কোথায় আমাদের পরিবার, ভবিষ্যত, পরবর্তী প্রজন্ম ? এটাকে বেঁচে থাকা বলে?পাচারকারী, চোরাকারবারী বলে লোকে আমাদের ঘৃণা করে, তার উপর এই রিস্ক আর আনসেইফ জীবন, এ জীবন থেকে ফিরতে পারিনা আমরা? -রবিনের পিঠে আলতো করে হাত রেখে নাবিলা বলল

‘হ্যাঁ আমারও কখনো ইচ্ছে হয় ফিরি -কোথাও। কিন্তু কোথায় ফিরবো? আদৌ কি ফেরার কোন পথ আছে?’ বলল -গ্রামগুলোর দিকে তাকিয়ে রবিন।

‘হয়তো নেই-হয়তো আছে।তবু আমি আশাকরি, আমাদের এই ফেরার ইচ্ছেটাই পথ ও গন্তব্য তৈরী করবে। দুজন যখন দুজনের হাতের উপর হাত রাখল একটা প্রত্যয়ে-আকাশে তখন সাদা মেঘের ইচ্ছেমতো উড়োউড়ি।

(110)

পূরবী সম্মানিত প্রভাষক, তেলিগাতী সরকারি কলেজ
গল্পকার, প্রাবন্ধিক
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : আকালি বাড়ি যায়