Home বই নিয়ে জলঘুমে অথরা : নিভৃতির মরমী ভূবন
জলঘুমে অথরা : নিভৃতির মরমী ভূবন

জলঘুমে অথরা : নিভৃতির মরমী ভূবন

63
0

বাংলা কবিতার খুব বৈভবশালী আর স্ফুর্ত একটি ধ্যান বা ধারার ভূখণ্ডটি যেন প্রকৃতি, এবং তাকে আশ্রয় বা তুল্য হিসেবে ধরে চিন্তা ও নন্দনে সঞ্চারিত হওয়া। এই প্রবণতাটিকে যদি বাংলা কাব্যের মূল হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, খুব একটা ভুল কী আর হবে! যেহেতু প্রত্যেকটা ভূখণ্ডেরই একটা স্বীয় চিন্তাভাবনা, কৃতি, সংস্কৃতি, ব্যাঞ্জনা, বৈচিত্রে তার প্রতিবেশীক প্রণোদনাগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেই একটা প্রভাব বিস্তার করেই, করবেই, আর এটাই মূলত একটি ভাষাগোষ্ঠীর সাহিত্য বা চিন্তা-চৈতন্যতে স্বকীয় স্বভাব বা চরিত্রকে নির্মিতি দানে অবদান রাখে, এবং কালে কালে যা প্রবাহিত হতে থাকে, কালের সাপেক্ষে, অর্থাৎ কালকে সম্মান বা বিবেচনায় রেখেই।  একটু খেয়াল করলেই আমার এই কথার যথার্থতা বা সত্য, উপলব্ধির বাস্তবতায় পরিলক্ষিত হবে বলে মনে করি।

যদি আমরা চোখ রাখি বিশ্বসাহিত্যের অপরাপর কিছু স্বকীয় ভূখণ্ডগুলোর দিকে, খুব সহজেই আমরা নাম নিতে পারি আফ্রিকা বা দক্ষিন আমেরিকা বা পারস্যের সাহিত্যের কথা। বলা বাহুল্য উল্লেখিত এসব এলাকার মানুষ, মানস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি,  মিথ বা জীবনকে খুব সার্থকভাবে উপজীব্য করেই এখানকার সাহিত্য আর সাহিত্যিকরা বিশ্বসাহিত্যের দরবারে প্রথিতযশা আর স্বকীয় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাদের খুব সহজাত প্রবণতার গুণেই। বাংলা কবিতাও ঠিক সেই প্রাচীণ কাল হিসেবে বিবেচ্য অর্থাৎ হাজার বছর পূর্বেকার সময়ের ‘চর্যাপদ’ থেকে যাত্রা শুরু করার কাল থেকে প্রায় কয়েক শত বছর পরের কালের আধুনিক কাল  উনবিংশ সালের ত্রিশ দশক, বা আজকের দিনের এই উত্তরাধুনিক বলে অনেকের কাছেই অবিহিত সময় পর্যন্তও যে তাঁর মৌল স্বভাব বা রীতির থেকে বিচ্যুতিকে মেনে নিচ্ছে না, বা নেবে না, তারই খুব স্পষ্ট একটি উদাহরণ হতে পারে এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের নতুন চিন্তা ও মস্তিষ্ক সম্বলিত একজন কবি সৌহার্য্য ওসমান, আর তাঁর ‘জলঘুমে অথরা’, গ্রন্থটি।

নিঃসন্দেহে বাংলা কবিতার আবহমান কালের যাত্রার সকল আইনানুগ রীতি-নীতি-স্বভাব-ভাব-রূপ-নন্দন-ঘোর-বিভোরতাকে খুব সচেতনে উপজীব্য করেই যেন বিস্তারিত হতে চেয়েছেন এই কবি, সৌহার্য্য ওসমান এই গ্রন্থে আত্মমর্যাদাবোধের দিকটির ব্যাপারে সর্বদা সচেষ্ট আর নিবিষ্ট থাকতে চেয়েছেন বলেই আমার মনে হয়েছে, এবং কবির এই গুণটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার, বিশেষত তাঁর কালের অধিকাংশ কবিরাই যেখানে স্ব-ভূম বা স্বদেশী বোধ বা চৈতন্যকে পাশ কাটিয়ে অতিমাত্রায় ভিন ভাব বা অভাবের এক ধরনের আরোপিত স্বভাব, যা অনেকটাই ডামাডোলে লিপ্ত থাকাটাতেই অতি-আধুনিকতা বা স্মার্টনেস হিসেবে ধরে নিচ্ছেন বা মানছেন, সেখানে কবি সৌহার্য্য ওসমান যেন বেশ আলাদা ও মর্যাদাপূর্ণ এক বৈরাগ্য আর নিভৃতির সৎ পথটিকেই তাঁর কাব্যের যাত্রাপথ হিসেবে সচেতনে বেছে নিয়েছেন, যা তাঁর কাব্যের নামকরণ থেকে শুরু করে নির্মাণ বা মননে মুহুর্মুহু অনুরনিত,  যখন এই কবি বলেন –

সমস্ত ফুল ঝরে গেলেও
ঝরে না গন্ধ
বাতাসের সরলতায় জমে থাকে
যে হিরন্ময়

( গন্ধ)

তখন তাঁর প্রকৃতি থেকে আহরণের চোখ যে ক্রমেই জাগ্রত একটি সংবেদনশীল মননকে উস্কে দিয়ে দার্শনিক সত্যের অন্বেষার দ্বারপ্রান্তে যাপিত অনুষঙ্গে গড়পড়তার জীবনের সকল কিছুকেই অন্য রূপে দেখার সক্ষমতায় উপনীত করছে তা বলা কি বাহুল্য হবে!  আমি মনে করি না, এবং এও মনে করি সত্যিকার নিরপেক্ষ কবিতার পাঠক মাত্রই সংক্রমিত হবেন বৈকি, কবি সৌহার্য্য ওসমানের এরকম পংক্তি বিন্যাসে। প্রথমে যে কথায় অনেকটা প্রারম্ভিক ভূমিকা টেনেছিলাম যে, বাংলা কবিতার প্রকৃতি আশ্রয়ী স্বভাব বা প্রবণতা বিষয়ক, কবি সৌহার্য্য ওসমান যেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেলেন। এখানে তাঁর ‘জলঘুমে অথরা’ নাম কবিতাটির কয়েকটি পংক্তি পাঠকের জন্যে রাখছি –

কথা বলতে বলতে পোষা বিড়ালের মৃত্যু
আবার মৃত্যুর সাথে সাথে নিঃসঙ্গ কবরস্থান

আর একবার মানুষের কাছাকাছি থেকে
দেখেছি কোনো এক মহান ডুমুরের ফুল

( জলঘুমে অথরা)

জীবনানন্দের ‘শ্রাবস্তী’ যেমন প্রকারান্তরে নারী বা অন্য কোনো সাত্ত্বিক পরিচয়ে পরিচিত হয় কোনো নগরীর অধিক, তেমনি একটা প্রচ্ছায়া যেন অঙ্কিত হয় নানা ক্লেদ ও ঘাতের জীবনে একটা মরমের আশ্রয় হিসেবে কবি সৌহার্য্য ওসমানের অথরায়, কখনো কাঙ্ক্ষিত নারীটির বেশে, নতুবা অন্য যে কোনো অভিজ্ঞতা বা তিক্ততার রেশে, এবং সমগ্র গ্রন্থেই এই অথরার অস্তিত্ব খুঁজে  পাওয়া গ্যাছেই একটা বোধের মতন, যা এই গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর জন্যে একটা সূতার মতনই বলা যায়;  কখনও বস্তু থেকে ব্যাক্তিতে, ব্যাক্তি থেকে বস্তুর মহিমায়, এবং সর্বোপরি সকল উপলব্ধির ধারকত্বে, এক্ষেত্রেও প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করা কোনো কবি হিসেবে সৌহার্য্য ওসমান যেন অনেকটাই সার্থক হয়েছেন বলেই মনে করি আমি, অন্তত তাঁর অথরাকে সে নিছক কোনো উল্লম্ফনের দ্রব্য হিসেবে গড়হাজিরায় কমই এনেছেন, বরং বেশ প্রাসঙ্গিক আর প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় রেখেই কবি সৌহার্য্য ওসমান যেন তাঁর সত্তার সমস্তটায় মিশিয়ে দিতে পেরেছেন মরমের সমস্ত অভিজ্ঞতা বা দর্শন, যা পাঠককেও ভিন্ন মাত্রায় ভাবার বা দেখার সুযোগ দেয়।

‘উপমাই কবিত্ব’ এই কথাটি সর্বান্তকরনে সত্য না মনে হলেও সার্থক আর স্বকীয় উপমা তৈরি সত্যিকার কবিত্বের এক বড় লক্ষণটিই বলা যায়, এই ক্ষেত্রেও এই কবির প্রয়াসে নতুনত্বের খোঁজ করার প্রচেষ্টাটি লক্ষনীয়, আসুন তাঁর আরেকটি কবিতার কিছু পংক্তি পড়া যাক-

“নালিখালি একটা গ্রাম
দূরে ভেঙে পড়ে পাতার বিমান

এরককম সূর্য ডোবার আগে
পাহাড়ের গায়ে লেখা আছে যে ঘর

ডালিম ফেটে যাওয়ার মতন জীবন যাপন
কেমনে আটকে ধরে থাকে এক শীতকাল

এ হাওয়া চুইংগাম; লেগে থাকে
ঠাডাকুড়ায় সারাক্ষণ, এমন নদীর কুলে যার হাল
পথে পথে ফুল আর কতো দীর্ঘায়ন!”

(নালিখালি)

কবিতাটিতে পাতার বিমান বা ডালিম ফেটে যাওয়ার মতন জীবন যাপন কিম্বা হাওয়াকে চুইংগাম বলা নিঃসন্দেহে সেই কবিত্বের পরিচায়ক যা বহুমাত্রায় দেখতে বা ভাবতে পারার সক্ষমতায়ই কেবল সম্ভবপর।  কবি সৌহার্য্য ওসমান, এরকম বহুভাবেই দেখতে চেয়েছেন চিরচেনা জীবনের বহুত কিছুকেই তাঁর একান্ত দেখায়, এবং যেটির তাৎপর্য অসীম আর  স্পর্শকাতর, এবং প্রথম কাব্যগ্রন্থেই এরকম উপমার সাক্ষাৎ কোনো কবির কবিতায় পাওয়া পাঠকের জন্যে একটা সুখবরই বলা চলে; যেমন লোকালয়ে পানের বরজকে দলছুট মনে করে যখন তিনি লিখতে পারেন-

“দলছুট পানের বরজ যেন বুনো ক্ষ্যাপা
ক্ষ্যাপাটে বাতাসে উড়ে
তাঁর শহীদ স্বজন সকল বুঝে নেয়
কাশফুল সাদা নয়-
গণকবরে মৃতদের সমাবেশ”

( কাশফুল)

তখন, তাঁর কবিত্ব নিয়ে বা কবিতা নিয়ে আশায় বুক বাঁধা যায়ই,  আর প্রথম বই হিসেবেই হয়তো তাঁর সামান্য ত্রুটি বা বিচ্যুতিকে পাশ কাটিয়ে দেখার লাইটি খুব একটা পাপ কার্য হিসেবে বিবেচনায় আনাটা খুব দায়িত্বশীল আচরণ হবে না বলেই আমার অভিমত, বরং এসব মার্জনায় এনে সাদামনে একজন কবির পূর্নাঙ্গ বিকাশের প্রতিজ্ঞার পথটির পানে চেয়ে থাকাই হবে যৌক্তিক আচরণ, যেহেতু কবি সৌহার্য্য ওসমানের সেই সম্ভাবনাটি কবি স্বয়ং দেখাচ্ছেন তাঁর কবিতাতেই, তথা জলঘুমে অথরায়, তাহলে পাঠক কেন তাঁর জন্যে অপেক্ষায় থাকবে না!

পরিশেষে বইটির গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোতে আমার পাঠে পরিলক্ষিত হওয়া প্রধান ত্রুটি হিসেবে লাগা অন্যতম দু’একটির মধ্যে যা না বললে গ্রন্থটির জন্যেই সুবিবেচনা  করা হবে না বলে মনে করছি,  সেগুলো হচ্ছে, কিছু কবিতার বাক্যবিন্যাসে পদপ্রকরণের দিকটিতে কবি  যেন খুব একটা সচেতনে ভাবেননি, বা পরিশীলনের ঘাটতি ছিলো বৈকি, পাশাপাশি কবিতায় যতির যথার্থ ব্যবহারেও বেশ খামতিগুলো গোচরে আসছিলো, তাছাড়া কবিতার পংক্তি বিন্যাসেও আরেকটু সচেতন হলে হয়তো বেশ কিছু কবিতাই আরও মোহনীয় হয়ে উঠে প্রকৃত স্বাদ আস্বাদনে সহায়তা করতো বলেই আমার বিশ্বাস, এবং প্রকরণের দিক থেকে বলতে গেলে মুক্তক আর মিশ্র ছন্দেই লিখিত এই গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরেকটু নির্মোহ সম্পাদনায় গেলে হয়তো কবিতাগুলো আরও বেশী মাত্রায় শাণিত রূপে ধরা দিতো, তবে এসব কিছুকে একটু সচেতনে আমলে নিয়ে লিখে গেলে আমি মনে করি বাংলা কবিতায় কবি সৌহার্য্য ওসমানের সম্ভাবনার দিকটি যারপরনাই উজ্জ্বল এবং অর্থবহ একটি স্বপ্নের মতোই।

(63)

নীহার লিখন জন্মঃ ৩ অক্টবর, ১৯৮৪, শিববাড়ী শেরপুর। বসবাস করেন ময়মনসিংহে, পেশাজীবনে একটি বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
বহুমাত্রিক শিল্পমাধ্যম নিয়ে কাজ করেন, মূলত কবি, গদ্যকার, অনুবাদক।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ ব্রহ্মপুত্র, আমি আপেল নীরবতা বুঝি, ব্ল্যাকহোল ও পড়শিবাড়ি, পিনাকী ধনুক, মনসিজ বাগানের শ্বেত।
অনুবাদ ও কথাসাহিত্য নিয়েও কাজ করেন। ইতোমধ্যে অনুবাদ করেছেন মিরোস্লাভ হলুভ, জন এশবেরী, ইবসেন, ইয়াং লি সহ অনেকের কবিতা।
বাই লিংগুয়াল এই কবির মৌলিক ইংরেজী কবিতাও ইতোমধ্যে দেশ ও দেশের বাইরে জার্মানি,আয়ারল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশের সংকলনে সংকলিত হয়েছে। তাঁর কবিতা অনুদিত হয়েছে রুশ, ইংরেজী ভাষাতেও বয়ান সহ বেশ কিছু পত্রপত্রিকা ও ছোটকাগজে তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম উপন্যাস ‘মধুপুর’ প্রকাশের অপেক্ষায়।