Home কবিতা বনভাতের কৈশোর
বনভাতের কৈশোর

বনভাতের কৈশোর

13
0

নৈর্ঋতের পদস্খলন

কিন্তু ক্যানো! ছন্দের বিঘ্নতা, হড়াৎ দিকবদল —
বেঢ়ল কা-কা রবের অতিষ্ঠতা কানে তুলে… ভাবি
উপযুক্ত বয়স ফেলে যাচ্ছি হেলায়, বেলা’টা ধরে রাখা উচিত ছিলো, রাখতে পারিনিঃ-

“অঙ্গ জুড়ে বেদাঙ্গ শূন্যতা”

প্রতিবেশীদের উৎসব, প্রতিবেদন – মনজ বিগড়ানো চিতা রৌদ্রছটায়..
রাতের প্রতিকৃতি এঁকেছে ক’টায়? কোন ঘনঘটায় নৈঃশব্দ্যে প্রকৃতি ডেকে বলে –

“ঘুমো গিয়ে”।

মাংসের পকেট থেকে বেরিয়েই ফরজ স্নান — এসব আর স্বপ্নে দেখতে চাই না,
ব্যবস্থা করুন — ইচ্ছানুরূপ এমনই করুণ।

করুণা পেতেও আপত্তি নেই, নিষ্পত্তিই মুখ্য —

কিন্তু ক্যানো! শাদ্বল — (রোমকূপের নিস্ফল শিহরণ)
ছন্দের বিঘ্নতা, অন্ধকারে ষাঁড়া ইশারা কে দ্যাখে? কে পায় তরঙ্গ? হয়তো কেউ, হয়তো কেউ না?
জেনেবুঝে উপলব্ধির খোঁয়াড়ে গড়াগড়ি খাওয়া মানুষের অধিকার –

এভাবেও অধরা রয়ঃ-

“মৃন্ময় সেঙো ক্রোধে জেগে উঠলে পরে — বোধ,
খসে গেলে নিস্তেজ, সম্ভাব্য প্রেয়সীদের করি রোধ।”


ব্যক্তিগত রচনা

ভেবেচিন্তে জিজ্ঞাসা রাখি
নিজাত্মা কে?
কে এই ভাগ্যবতী? উৎসর্গঃ- করো হলো
সায়েরা কে?
(কল্পান্তঃ একশত সাতষট্টি বছরের দূরত্ব নিয়ে
সায়েরাকেই ধরে নীলাম ব্যক্তিগত
শুভাকাঙ্ক্ষী)

(উৎসর্গঃ – আব্দুল মান্নান সৈয়দ।)


এক.

আষাঢ়স্য দিবসের শেষ দিকে নীপদ্রুম শোভাহীন,
প্রণয়িহীন নিজাত্মা তেমনই মলিন –
বহুদিন আগেকার চেনা পথে হুটহাট বিগত শরীরের দোদুল্যমান ছায়া ভেদ করে..
যাবতীয় কোলাহলে ফেটে পড়ি এলোমেলো –
গ্রীবানত কমলা দ্যুতির প্রতিবিম্বিত নাচের ভেতরে দেখি নিজের আশ্চর্য আনুগত্যকে –
যে কিনা মানুষের মৃত বিচ্ছুরণ ,
এবং ফেরারির ইস্তফা নিয়ে কবিতার প্রতি ফিরে আসার কারণ খুঁজতে গিয়ে
আবারো দগ্ধ হই ব্যার্থতার সঙ্গত স্ফুলিঙ্গে।

(প্রাক্তন গ্রাস করেছে আধেক –
সাদৃশ্য সূর্য চাঁদে
যে কিরণ আলো দেয়, তাপ দেয়, জ্বলে ওঠো তারই কাঁধে। – অবাধে)

পুনরাবৃত্তির দস্তখতকে কেউ কেউ পঙক্তি বলে আওড়ায়
কেউ কেউ সশব্দে শব্দের পাশে শব্দ বসানোর কালিমা লেপন করে
তা স্বত্তেও নিষ্প্রভ থাকি, নির্বাক থাকি –
থাকতে হয়
বিমর্শে সম্পর্ক খুয়ানোর ভয়ে হজম করি দম্ভোক্তি, বিগত কেলেংকারীর বিরাজমান আতঙ্কে নিঃশব্দ বনে যাই
আর সোস্যাল মিডিয়ার তাবৎ পাতায়
অনুরূপ (ছায়া) কাব্যের জনপ্রিয়তা বর্তমানে ঈশ্বরতুল্য,
য্যানো মুড়ি চানাচুরের ঠোঙা না হয়, সে কামনায় লিখতে ভুলে যাচ্ছি।
ভুলে যাচ্ছি – আত্মবোধ
ভুলে গেছি – প্রত্যাঘাত (কিভাবে হানতে হয়!)
বেকার প্রাতঃপান গেলাসের ঢকঢক ধ্বনি ছাপানো কর্কশতা শুনে
মূকাভিনয় করে যাই
য্যানো কিছুই হয়নি।

আমি নিস্প্রভ থাকি
নির্বাক থাকি,
থাকতে হয়, লৌকিক বিবর্তনে।

ধীরোদাত্ত ঘরকর্তার অনুশাসনে শিখেছিলাম আদব
সততার উপদেশ
বেথুয়া বন উজাড় করা অভাবের দিনগুলোয় তিনি বলেছিলেন
– “কারো নিকট হাত পাততে নেই”
ডাল ভাতের প্রয়োজনে নির্বাক ছিলাম, ছিলাম কাঠপুতুল –
বীর্যদাতার সম্মানে।


দুই.

আর শুধু মনে পড়ে উচ্চাভিলাষের অন্তিম পরিণতি
এবং আমরা সকলেই জানি
ঊষালগ্নে কুয়াশার মতই উবে যায় যাবতীয় দুঃখ,
এবং ব্যস্ততার উড্ডীন নির্মমতা আমাদের বাঁচতে শেখায়,
অস্তমিত সূর্য্যলোকের সুযোগে পশ্চিমাকাশের গাল বেয়ে নেমে আসে আলকাতরা – ঝিঁঝিট ক্যাঁচ ক্যাঁচ,
জোনাকির আলপনা,
গাছপাতাদের ঐকতানে মূর্ছা যাওয়া কংক্রিট আবাসে
অবশ হয়ে রাতের শিয়রে বাকবিতণ্ডা হয় নিদারুণ ।

সহবাস বান্ধব তাফালে আঙ্গার – মড়িপ্রেত অতীতের ঝটিকায় মরি..বাঁচি তার টানে পুনরায়, মোমের ওম ছোঁয়া উইয়ের পতনে নিশ্চল গন্ধ পেয়ে বসে খুব,
তামাকদণ্ডের উষ্ণা’সুখ ঝেরে
ওষ্ঠের কিসমিস খুটে সদুত্তর মেলানোর চেষ্টা করি
কে এই ভাগ্যবতী? উৎসর্গঃ- করা হলো
সায়ারে’কে?
তিনিও কি সুদূরমগ্নতায় পড়ে থাকে?
(আমার মতন)

হ্যাঁ, পড়ি থাকি হেথায়,
যদিও সে বিরহফুল – পেস্তা শাখার টিয়ে
ত্রিকাল, তন্দ্রা, ঘুমের মাঝেও তোলে বিষিয়ে।
(তুমুল)

তবুও
তবুও,
কোন উপমার খোয়াবে গড়ি তারই মূর্তি?
উপাসনার মধ্যমাংশে কার্বনিক নেত্রতটে গড়িয়ে পড়লে কয়েক ফোঁটা গ্লানি –
ধরে নিই
আমি এঁকে নিই আমার বিচ্ছেদ বিয়োগই পূর্বনররিক্ত মুখ
বিমুখ অসুখে এড়িয়ে যাওয়া পরবর্তীদের পরবর্তী পতন
অবলোকন করি স্বচক্ষে।


তিন.

শুনেছি,
যোনিপদ্মের চ্যাঁড়চ্যাঁড়, দেখেছি রক্তে
ভাড়া ঘরের অবকাশে –
সঙ্গম ওয়াক্তে
– শীৎকার।

কথা ছিলো জড়ায়ুদ্যানে মকরন্দ ফুটবে
অথচ হংসপ্রেম পায়নি চাঁদোয়া মৈথুন
ঝরনাজল কৌমুদী সাঁতরে পান করা হয়নি বৈধ সঙ্গমের অমৃত,
ঋতুধারা পরবর্তী কর্ষণের পূর্বেই জুটেছে হেমলক মেহেসুস।

– পতনের মহোৎসবে বিবমিষু
অমানিশা হাতড়ে বেড়িয়েছি পুরোগামি রাঁড়,
যাকে একক বাসনায় বাসতে পারি ভালো।

কিন্তু না
বনতি মেলেনি সমকালীন নারীতে
আর যাকে পেয়েছি – তিনি মধ্যবয়সী সুভব্য, গোলগাল বাটির মতন স্থুল নিতম্ব,
উপচে পড়া ঝুলস্তন – মেদ তার কোমল অদ্রি
উদর সুড়ঙ্গ এক অতল রাত্তির সোপান
পানের তৃষ্ণায় খাঁ খাঁ উৎপীড়নে উগরে দেই কামজল –

মনস্কাম তাকে শয্যার।

দর্শনের মধ্যামাঙ্গুলি ঠেলে শর্বর জঙ্ঘা ঘুরে আসার বর্বরোচিত উর্ণনাভ বুনেছি প্রকাশ্যে

কবি – আপন করে নেবেন?


চার.

মনের অপযশ বেড়ে গ্যালে –
উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে আদ্যোপান্তে, দুর্দান্ত কুম্ভক অজড়তা নেমে এসে………
বহুবিধ অব্যক্ততা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে ।

জানকী সম্পর্কে বধ্যমূল ধারণা’কে অস্বীকার করতে পারি না,
আবার গলাধঃকরণও মুশকিল – এই দোটানায় পড়ে উপলব্ধি করলাম
‘হস্তশিল্প’কে বৈধ ঘোষণা করা
– কতোটা জরুরী।”

অবশ্য,
এই জ্বরগ্রস্থ রাতভ্রমের প্রলাপে কেউ কেউ পাক পবিত্রতা প্রসঙ্গে
প্রশ্ন তুলতেই পারে,
তাদের জন্য ঢেউড়ি’র পেছন দরজা খোলা।

বাকি’টা বুঝে নিন।


শুলফার বন

শুলফার বনে শুয়ে আছি —
নুয়ে পরা ফুলে দোলে মৌমাছি
বিকেলের ছায়া কালো;
অন্যমন ঢিল, পুকুরের জল হাসালো
ফুলে ফুলে খেলা করে মৌমাছি –
শরীরী দুরত্ব বাড়লেও, আছি হৃদয়ের কাছাকাছি।

কলাপাতা ছেঁড়া আকাশ
মৃদ কেঁপে ওঠা গ্রীষ্মের ঘাস —
শ্বেতনীল মিশ্রিত ছাদে
পড়ে আছি বিরহ বিকেলের খাদে,
দমকা নড়ে ওঠে শুলফার বন
প্রেম নেই, প্রেমিকা নেই — আপাতত সেই আপন।

দূরে ড্যাবড্যাবে পানিতাল
গাছটায়, মরাপাতা দেয় সামাল;
তলাতেই গিটারের চর্চা
আনপ্ল্যাগড মাইনর সুর খরচা,
নিয়ে নিই হারমনিক —
বাছাই শেষে বেদনাই ঠিক।

বহুকাল পরে ঝরা কান্না —
এতটাই ঘন — “স্বয়ং প্রভুও বোধ’য় চান না”
চুয়ে পরা পাইকারি নিনাদ
চেয়ে দ্যাখে অপলক, শ্বেতনীল ছাদ
শুলফার বনে কমছে আলো
এবার, উঠে পড়াই ভালো।


সব-ভোঁতা

পূর্বমুখী আভায় দখল হওয়া সভ্যতা
দিনের নাম ধারণ করে —
বয়োবৃদ্ধার সম্ভ্রম রুখেনি সকল প্রশংসাপ্রাপ্ত
না দেখা আস্থা।

আদিম পেশার গর্ভে লেলিহান ফাল্গুনের ধ্বংসলীলায়
পুড়ে গ্যাছে নায্য মূল্যের খোয়াব,
সোনালী আঁশে ফেঁসে যাওয়া করুণ নিনাদ বেজেছিলো
সেদিনের ব্রতানুসারী মিছিলে।

নির্বাক —
নিশ্চল, নির্বান্ধব – অসহায়, পুরো সভ্যতার সব-ভোঁতা মনে হয়। অনুকরণের যুগে বর্বরতা ঢুকে পড়ছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে — দুরাশার প্রতি অবনত চঞ্চঃ —
ফিরে যাও নিঃস্ব।

বেহুঁশ গণতন্ত্রের চটুলরচনায় মধ্যবিত্ত তকমা সাঁটা জনপদের পদে পদে নিগৃহীত বক্তব্য মরে পড়ে থাকে বেওয়ারিশ, মূর্খ কাকা’লোর সান্নিধ্যে জন্মানো অন্ধ বধির কবির ঠোঁটে সূচ ফুঁটিয়ে বন্ধ করা হলো ধ্রুব আবৃত্তি।

জীবনধারণের খসড়ায় অজস্র ছক এখনো ফাঁকা —
বন্ধ্যা মূহুর্তের পারদে চড়ানো ইতিহাস, আগামীতে কে দেবে নেতৃত্ব?
আজকের সভ্যতায় মুখাগ্নি করা সেই ধর্ষক কিশোর?
নাকি বিনোদন চিত্রে খ্যাতি পাওয়া
স্বেচ্ছায় সতীত্ব বিকানো নারী ?

দুরাশার প্রতি অবনত চঞ্চু – ফিরে যাও নিঃস্ব।


সে আমার ভালো বন্ধু

চৌর্যবৃত্তির দায়ে সমাজত্যাগি ছেলেটার পিঠ চাপড়ে গল্পে মাততে মন্দ লাগে না..

– সে আমার ভালো বন্ধু।

কখনো কখনো ঘামে ভেজা মোচড়ানো টাকায়
লুচির বিল দিয়ে দে
বনভাতের কৈশোর ফিরিয়ে আনে
তুমুল আড্ডায়।

উদাস সয়াহ্নের দীর্ঘশ্বাস গুনতে গুনতে কবিতা আবৃত্তির আবদার করে,

মাঝপথে উঠে পড়ে

প্যান্ট ঝাড়ে,
ময়লার সাথে ঝরে যায় ঊষাডুব কমলা।
ওর ঘরে প্যারালাইজড মা
হাঁটতে কষ্ট হয়,

কেনাকাটা, রান্নাবান্না, বাসনকোসন মাজা

কাপড় ধোয়া
এবং আনুষঙ্গিক কাজগুলো ও’ই করে।
স্ট্রোক করা বাবাটার নষ্ট কাপড়ে চলাফেরায় কষ্ট
তাই কমবেশি সবাই তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।
দু’টান সিগারেট ফোঁকার আকুতি চোখে পড়ার মতো মায়া লাগে খুব – হায় অসহায়ত্ব,
লোকটা মাস্টার ছিলো
শুনেছি, ধনসম্পত্তিও কম ছিলো না।

ঘরছাড়া আমি –
“ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেছে,
বিড়িটিড়ি খায়, হাজি সাহেবের মেয়েটার পেছনে সারাদিন লাইন মারে,
রাত্তিরে দোতালার জানালায় ঢিল ছোঁড়ে
গার্লস ইস্কুলের সামনে থেকে একবার পুলিশে পেদিয়েছিলো।”
পাড়াপড়শি মুরব্বিদের এইসব কানাঘুষায় আজকাল কর্ণপাত করি না।

ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকি।

এদিকে ছোট ভাই ফোনলাপে পরামর্শ দে ” ক্ষমা চাইতে বলে”
বাসায় ফিরে যেনো আর এসব না করি –

কোনও উত্তর দেই না,
চুপ করে ফোনকল কেটে দেই – চায়ের কাপে হাত গরমের চেষ্টা,
আমাদের নিকোটিনেরা পৌষের শীতে মিশে যায়।

বাসায় দুদক অফিসের লোকজনের আনাগোনা
একবার দ্যাখা করতে বলেছিলো,

– জেলগেটে যাইনি।

ঘুষখোর পিতার পরিচয় মুছতে আমার করণীয় কি?
ভাবতেও ঘেন্না লাগে
সুতীব্র গ্লানিতে
ফের গর্ভাশয়ে ফেরৎ যেতে ইচ্ছে করছে –

চৌর্যবৃত্তির দায়ে সমাজত্যাগী ছেলেটার সাথে আমার উঠতে বসতে সমস্যা হয় না

– সে আমার ভালো বন্ধু।

ও অভাবে, আমার জনক স্বভাবে।

(13)

নৈর্ঋত শাহরিয়ার নৈর্ঋত শাহরিয়ার এর জন্ম ১ মে ১৯৯০। পিরোজপুর জেলা শহরেই বেড়ে ওঠা।

নৈর্ঋত শাহরিয়ার এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ — "সুরমাদানিতে ব্যক্তিগত চোখ" অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত হয় বিদ্যানন্দ প্রকাশনী থেকে।