Home গদ্য বাংলা সাহিত্যে কবিদের উপাধি ধারণ
বাংলা সাহিত্যে কবিদের উপাধি ধারণ

বাংলা সাহিত্যে কবিদের উপাধি ধারণ

128
0
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন ‘কবিগুরু’- এই প্রশ্নের সঠিক জবাব সহজ নয়। অনেকে বলেন, ‘কবিগুরু’ উপাধিটা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তাঁকে দিয়েছিলেন; আর রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজীকে ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। আবার কেউ বলেন, ক্ষিতিমোহন সেন রবীন্দ্রনাথকে ‘কবিগুরু’ উপাধি দিয়েছিলেন। ইতিহাসে এই দুই মহারথি কাজ দিয়ে সমকাল ও উত্তর-প্রজন্মের কাছে অনেকখানি মান্যতা পেয়েছিলেন। তবু সবাই যে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান বুঝিয়ে দিয়েছেন- এমন নয়। তাদের পারস্পারিক এই উপনাম গ্রহণের উপায়টি একেবারে প্রশ্নহীন নয়। গান্ধীজী কবি ছিলেন না, আবার রবীন্দ্রনাথের ভক্ত হলেও তাঁর শিষ্য ছিলেন না। সহকর্মী বা সহবাসী বলা যেতে পারে, কিছুদিনের জন্য তিনি শান্তিনিকেতনের আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আবার কবিগুরু রাজনীতি করতেন না, কিন্তু তিনি গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে।
একজন ব্যক্তি যে কারণে অন্যের দ্বারা মহাত্মার আসনে উন্নীত হতে পারেন, রবীন্দ্রনাথের কাছে গান্ধীর ভূমিকা সে কারণে উন্নীত হওয়া প্রায় অসম্ভব। অবশ্য বস্তুগত প্রাপ্তির বাইরেও ধারণাগত অভাববোধ জীবনে কম নয়, যেখানে এক একটি সম্পর্কের দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠে। তবু তাঁদের পারস্পারিক উপাধি গ্রহণের বিষয়টি একটা উচ্চবর্গীয় ব্যাপার বই কি। ভাষা-সাহিত্য ও জাতির জীবনে তাঁদের অবদান সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত হওয়ায় তাদের উপাধি নিয়ে প্রশ্ন করা অনেকের দৃষ্টিতে অর্বাচীনতার পর্যায়ে পড়ে। আবার ক্ষিতিমোহনের কথা বলা হয়, তাঁরও কীর্তি কম নয়। তিনি নিজে নোবেল না পেলেও তাঁর দ্রৌহিত্র অমর্ত্য সেন নোবেল পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাবকের ভূমিকা আছে বলে অনেকে মনে করেন। ক্ষিতিমোহনের কবীর অনুবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে কবিগুরু গীতাঞ্জলি রচনায় হাত দিয়েছিলেন। এ আলোচনা আমি ‘সন্তকবীর শত দোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে করেছি। কবিগুরু খেতাবের ক্ষেত্রে মহাত্মার চেয়ে ক্ষিতিমোহনের দাবি অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়, কারণ রবীন্দ্রনাথ প্রকৃত অর্থেও ক্ষিতিমোহনের গুরুস্থানীয় ছিলেন।
ধরে নেয়া যায়, রবীন্দ্রনাথকে ‘কবিগুরু’ উপাধি দিয়েছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। এ উপাধি তাঁকে দেয়া না হলেও তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনের আচার্য, ছাত্ররা তাঁকে নিশ্চয় গুরু বলে সম্বোধন করতেন। শিক্ষককে ‘গুরু’ বা ‘উস্তাদ’ বলাই দেশীয় দস্তুর। রবীন্দ্রনাথের কালে গুরু বা উস্তাদের সংখ্যা অনেক হলেও সব গুরুই কবি ছিলেন না। কেউ কেউ কবি হলেও রবীন্দ্রনাথের মতো ছিলেন না; রবীন্দ্রনাথ কবিদেরও গুরু ছিলেন। তাঁকে সে অর্থে ‘কবিগুরু’ বললে নিন্দুকদের কি বলার থাকে। স্বীকৃতির জনমতে ও তুলনামূলক বিচারে তিনি কবিদের গুরু হবেন এতে আর সন্দেহ কি। কেউ তাঁকে সে পদ না দিলেও তাকে কেউ ফাঁসি দেবে না।

বিবিসি’র জনমত জরিপে রবীন্দ্রনাথকে হাজার বছরের সেরা বাঙালির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রাখা হয়েছিল’’

বিবিসি’র জনমত জরিপে রবীন্দ্রনাথকে হাজার বছরের সেরা বাঙালির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রাখা হয়েছিল

যে কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি তার বিদ্যালয়ে গুরু থাকার যেমন প্রয়োজন নেই, যার কাছে কবিতার মূল্য নেই তার কাছে কবিগুরুর কি মানে! বিবিসি’র জনমত জরিপে রবীন্দ্রনাথকে হাজার বছরের সেরা বাঙালির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রাখা হয়েছিল। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতের জাতির পিতা, তাই বলে ভারতের সবাই তাঁকে মহাত্মা বলে মানে এমন নয়।‘কবিগুরু’ উপাধির একটা কিনারা করা গেল, কিন্তু ‘বিশ্বকবি’ উপাধি রবীন্দ্রনাথকে কে দিয়েছিলেন- তার হদিস নিশ্চয় সঠিক মতো পাওয়া যাবে না। নোবেল পাওয়ার পরে তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যরা নিশ্চয় তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করে থাকবেন। নিশ্চয় তিনি লোকজনকে শিখিয়ে দেননি এহেন সম্বোধন করতে। তবে এ কথা মানতেই হয়, কেউ নোবেল পাওয়ার পরে যদি বিশ্বের সঙ্গে যুক্ততা না ঘটে, তাহলে কে আর এই উপাধির যোগ্য হবেন। অনেকে যুক্তি দেবেন, বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ অন্য নোবেল বিজয়দের মতো ততোটা পরিচিত নন। আবার রবীন্দ্রনাথ যতটা বহুমুখী লেখক- নোবেল প্রাপ্তদের অনেকে তাঁর পংক্তিতে বসতে পারেন না। বিশ্বে আজ পর্যন্ত এমন কেউ জন্মানি- যাকে সারা বিশ্বের মানুষ এক নামে চেনেন, মানেন। এক জাতির বীরনায়ক অন্য জাতির খলনায়ক- সবখানে রাম ও রাবনের খেলা। এক ধর্মের নবী অন্য ধর্মে কপটচারি। তাই সবার মত বিবেচনা করার দরকার দেখি না। তবে একটি সূত্র বলছে, ব্রাহ্মবান্ধব উপাধ্যায় নামক এক ধর্মপ্রচারক ও ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলনের নেতা রবীন্দ্রনাথকে প্রথমে ‘বিশ্বকবি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে শেক্সপিয়ারকে বিশ্বকবি বলেছেন। বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ মহাকবি তাতে সন্দেহ কি, যদিও তিনি মহাকাব্য রচনা করেন নাই। তবু প্রকৃত মহাকবি মাইকেল গ্যাটে মিল্টন হোমার ও বাল্মীকির ধারার বাইরেই তাকে থাকতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে কেবল কবিগুরু নয় ‘গুরুদেব’ও বলা হয়। নোবেল প্রাপ্তির পরে শান্তিনিকেতন আশ্রমে তাঁকে ‘গুরুদেব’ বলেই সম্বোধন করা হতো। কবিগুরুকে কবে থেকে গুরুদেব ডাকা শুরু হলো সেটিও বিবেচনার বিষয়। ধনীর দুলালের অনেক আদুরে নাম। কবিগুরুর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কোথা থেকে মহর্ষি উপাধি পেয়েছিলেন, ঠাকুর্দা দ্বারকানাথ কিভাবে প্রিন্স হয়েছিলেন- এসব প্রশ্নও কারো মনে জাগতে পারে।

“সারা পৃথিবীতেই অধিকাংশ লেখক একটি নতুন নাম গ্রহণ করে থাকেন’’


রবীন্দ্রনাথের আরো অনেক ছদ্মনাম ছিল, যেমন ভানুসিংহ, কারণ তিনি ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী লিখেছিলেন। এছাড়া অশপটচন্দ্র ভাস্কর, আন্নাকলী আকড়াশী, দিকশূন্য ভট্টাচার্য, শ্রীনবীনকিশোর শর্মণ, শ্রীষষ্টীচরণ দেবশর্মণ, বাণীবিনোদ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিদ্যাবিনোদ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীমতি কনিষ্ঠা, শ্রীমতি মধ্যমা প্রভৃতি। এসব নামে তিনি লিখেছিলেন, শুধু পুরুষবাচক নয়, নারীবাচক নাম ধারণও তিনি বাদ দেননি। এমনকি তিনি যখন ‘ ইউরোপ-প্রবাসীর পত্র’ লিখতে ছিলেন তখনো তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করছিলেন। এখানেই শেষ নয়, রবীন্দ্রনাথ কেবল নিজের নামই পাল্টাননি, কাছের মানুষদের নামও সযত্নে পরিবর্তন করেছেন। নিজের স্ত্রীর নাম ভবতারিণী পাল্টে মৃণালিনী রেখেছিলেন। প্রেমিকাদের নাম রেখেছিলেন নলিনী, বিজয়িনী প্রভৃতি। বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক কবিগণ কেউই এ প্রশ্ন তোলেননি যে, এটি রবীন্দ্রনাথের উচিত কর্ম কিনা। বেণীমাধবের মেয়ের নাম ঠাকুর বাড়িতে বেমানান। কারো নাম পরিবর্তন হলে তার অতীতও পরিবর্তন হয়ে যায়। কিন্তু কবি সাহিত্যিকগণ হর-হামেশা এই কাজটি করে থাকেন। কেবল ভবতারিণী নন, তাঁর সকল প্রেমিকাই একটি রাবীন্দ্রিক নাম পেয়েছিলেন। লন্ডনে ডাক্তার স্কট সাহেবের মেয়েদের আসল নাম তিনি গোপন করেছিলেন; অবশ্য এ ক্ষেত্রে গোপন করা উচিতকর্ম। আমরা মেনেই নিয়েছি যে কাজ রবীন্দ্রনাথের জন্য খেলা তা সাধারণের জন্য আত্মঘাতী।
আশির দশকে ঢাকা শহরে সাহিত্য সম্পাদকগণ কবিযশপ্রার্থীদের নাম হর-হামেশা পরিবর্তন করে দিতেন। ধরেই নেয়া হতো পিতৃপ্রদত্ত আদিম নাম রেখে কারো পক্ষে লেখক হওয়া সম্ভব নয়।
কেবল এদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই অধিকাংশ লেখক একটি নতুন নাম গ্রহণ করে থাকেন। অনেকটা ব্যাপ্টাইস্ট, উপনয়ন বা খাতনার মতো ব্যাপার। একটি পর্যায় থেকে অন্য একটি পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার মানসিকতা থেকে এই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা সমাজ জীবনে কাজ করে। এদিক থেকে মনে করা যায়, লেখা কোনো অকৃত্রিম বিষয় নয়, লেখা হলো একটি মেকি বানানো শিল্প, যা নির্মাণের জন্য প্রকৃতি থেকে আলাদা হতে হয়। একজন কৃষকের জন্য যেমন একজন লিখিত ভাষার কবির দরকার হয় না। তাই তার জন্য নতুন নামেরও দরকার হয় না। হরিদত্ত চোখে হয়তো কিছুটা কম দেখতেন, কিন্তু তাতে কি, কানা হরিদত্ত নামেই তিনি বিখ্যাত হয়ে গেলেন! গুণ না থাকলে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখলেও লাভ নেই।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথকে কবিগুরু না বলে স্যারও বলা যেতো। ইংরেজরা তাঁকে স্যার রবীন্দ্রনাথ টেগর বলতেন। তিনি ছাত্র পড়ানোর সুবাদে গুরু হলেও সেই সুবাদে হয়তো মাস্টার মশাই বা স্যার নন। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়, ব্রিটিশ রাজ তাঁকে ‘স্যার’ খেতাব দিলেও তিনি তা বহন করতে অপারগ ছিলেন। ডায়ার সাহেব জালিয়ানওলাবাগে গণহত্যা না ঘটালে, খেতাবের ঔপনিবেশিক জোয়াল তাঁকে হয়তো এখনো বইতে হতো। যেমন তাঁর সময়ে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, স্যার নীলরতন সরকারসহ অসংখ্য স্যার রয়েছেন। রানির সাম্রাজ্যের যাঁরা সম্মানবহন করেন তাদের স্যার উপাধি দেয়া হয়। আরো আগে যারা রানির হয়ে লড়াই করতেন তারা নাইট বা স্যার হতেন।

“রবীন্দ্রনাথের পরিবার ব্রাহ্মণ হলেও খাঁটি নন, পতিত। তাঁর পূর্বপুরুষ মুসলমানদের অন্ন গ্রহণ করার ফলে নিজ বর্ণবিচ্যুৎ হয়ে ‘পিরালি ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন’’


এবার আসি রবীন্দ্রনাথের ‘ঠাকুর’ পদবীর কথা। রবীন্দ্রনাথের পরিবার ব্রাহ্মণ হলেও খাঁটি নন, পতিত। তাঁর পূর্বপুরুষ মুসলমানদের অন্ন গ্রহণ করার ফলে নিজ বর্ণবিচ্যুৎ হয়ে ‘পিরালি ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। হিন্দুদের মধ্যেও তাঁরা চরম সংখ্যালঘুত্বে পরিণত হয়েছিলেন। এমনকি তাদের বাড়ির ছেলেমেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী পাওয়াও ছিল দুষ্কর। পিরালি ব্রাহ্মণ থেকে ঠাকুর হওয়ার আগে তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন বন্দ্যোপাধ্যায়যুক্ত ব্রাহ্মণ। এ প্রশ্নও অবান্তর নয়- তাঁরা ঠাকুরই বা হলেন কি করে। মুসলমানরা ভারতে আসার আগে হিন্দুদের মধ্যে ঠাকুর শব্দটি ছিল না। এটি একটি মুসলিম তুর্কি শব্দ। রায়বাহাদুর, খানবাহাদুর, সৈয়দ চৌধুরী সহ সকল পদ রাজপ্রদত্ত প্রশাসনিক পদ। সে পদের কর্ম আজ বিলুপ্ত হলেও কেউ নামের অংশ থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না। কেউ পুরনো রাজার ‘খান’ হয়ে এখনো খেয়েই যাচ্ছেন, আবার রাজার হয়ে গুণিন হয়ে আদিকাল থেকে গুণ টেনেই যাচ্ছেন।
এ সময়ের কবিরাও উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁদের পদবী যুক্ত করছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর না হলে নিশ্চয় কবিদের নাম টোকন ঠাকুর, শ্মশান ঠাকুর, কমল ঠাকুর হতো না। অবশ্য এটা দোষের নয়, কারণ এই নামবাচক ব্যক্তিদের অনেকেরই এখন এটি ছদ্মনাম নয়। বরং এই নামই তাদের একমাত্র নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার অনেকে তাদের দুষ্কর্ম আড়াল করার জন্য এ ধরনের ছদ্মনাম ব্যবহার করে থাকেন। তারা যখন নিজের লেখাটি লেখেন তখন পরিচিত প্রকাশ্য নাম ব্যবহার করেন, আর যখন অন্যকে গালমন্দ, নিন্দা, নিজের ভালত্ব ও ইচ্ছা প্রকাশ করতে চান তখন মলম ঠাকুর, কলম ঠাকুর এই সব নাম ব্যবহার করেন।
নামগ্রহণ বা নামধারণ প্রায়ই ব্যক্তির পেশা অনুসারে হয়ে থাকে, আবার বিদ্যালয়ের শিক্ষার ডিগ্রিগুলো অনেকে তার নামের সঙ্গে বহন করেন। এ দেশে পারিবারিক পদবীগুলো পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। শিল্পযুগের আগে মানুষ বংশপরম্পরায় যে পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকত সেই পেশাই তার গোত্রের পরিচয় হয়ে যেতো। বিয়েশাদিও তাদের পদবীভিত্তিক গোত্রের মধ্যেই হতো এতে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেতো। এই প্রথা মেনে না চললে পরিণামে অনেকটা ভোগান্তি হতো। যেমন একজন কামারের মেয়ে কুমোরের বাড়িতে আসলে তারপক্ষে কুমোরের চাকা ও কামারের হাপরের পরিবর্তন ঘটত। সরকারি দপ্তরে যারা কাজ করতেন তাদের জন্যও একই ব্যবস্থা ছিল। এখন যদিও একই প্রথা রয়েছে, তবু পেশাগত পরিচয় ব্যক্তির গোত্রে প্রভাব ফেলছে না। কিন্তু পূর্বেও পেশাগত পদবী তাকে রেখেই দিতে হচ্ছে। সৈয়দ খান চৌধুরী ভট্টাচার্য রায়বাহাদুর খানবাহাদুর- পদবী বহন করতে উত্তর-পুরুষও গুরুত্ববহন করে। ইংরেজরাও বংশের এই পরিচয়কে প্রথম নাম হিসাবে ব্যবহার করে।
বিদ্যাসাগরের আমলে দেশে অনেক বিদ্যাসাগর ছিলেন। কারণ ‘বিদ্যাসাগর’ মূলত সংস্কৃতি কলেজের ডিগ্রি। যেমন আমাদের বিদ্যাসাগরের প্রতিদ্বদ্বী তারানাথ তর্কবাষ্পতির ছেলে জীবনানন্দ বিদ্যাসাগর, নীলকমল বিদ্যাসাগর, প্রাণকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর, রাজীবলোচন বিদ্যাসাগর, শশীশেখর বিদ্যাসাগর প্রমুখ। কিন্তু আমরা বর্তমানে একজন বিদ্যাসাগরকেই চিনি, তাঁর প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে দয়ার সাগর বা করুণার সাগরও বলা হতো। বিদ্যাসাগরের এই উপাধি তাঁকে দিয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ব্যক্তিগত সুবিধাভোগের ফলে, বিদ্যাসাগর মাইকেলকে টাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। ১৮৪৩ সালে মধুসূদন দত্ত খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে মাইকেল নাম ধারণ করেন। মধুসূদনের পদবী দত্ত থাকা সত্তেও মাইকেল নামটিই সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পায়। লোকজন এ নামে তাঁকে ডাকতেই বেশি পছন্দ করেন। তিনি মহাকাব্য লিখেছিলেন বলে লোকজন তাঁকে মহাকবিও বলেন। বিদ্যাসারের মতো তখন অনেকে বিদ্যালয়ের ডিগ্রি নামের সঙ্গে বহন করতেন। যেমন বিদ্যাবিনোদ, তর্কালঙ্কার, কাব্যালাঙ্কার, শাস্ত্রী। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কথা আমরা অনেকে জানি, তার নাম হরপ্রশাদ বন্দ্যোপাধ্যায় শাস্ত্রী। তাঁকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও বলা হয়। কারো কারো উপাধি ছিল বিদ্ববল্লভ, যেমন বসন্তরঞ্জন, তিনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পুঁথি আবিষ্কার করেছিলেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বর্তমান ধারার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে লোকজন নামের শেষে বিএ, এমএ ডিগ্রিও ব্যবহার করতেন। শুরুর দিকে হয়তো পুরো জেলা মহাকুমায় একজন বিএ, এমএ পাস লোকের সন্ধান মিলতো না, শিক্ষার এই ডিগ্রি অন্যদের থেকে তাদের আলাদা করে দিত। এখন অনেক নামের শেষে পিএইচডি ডিগ্রি লাগাতে অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ডক্টর এনামুল হক, ডক্টর মুহম্মদ আবদুল হাই না বললে আমাদের চিনতে কষ্ট হয়। কারণ তাঁদের শিক্ষার এই ডিগ্রি অনেকটা নামের অংশ হয়ে গিয়েছে। অথচ পিএইচডি ডিগ্রির মূল্য একর্থে এমএ ডিগ্রির চেয়ে অপ্রয়োজনীয় হওয়ার কথা। কারণ এটি মূলত শিক্ষকদের পদোন্নতি ও চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে বেশি যুক্ত। অন্য পেশার লোকজনকে এই ডিগ্রি অর্জন করার সঙ্গে তার পেশাগত কোনো সুবিধার কারণ ঘটে না। এই পদবী ব্যবহারের সঙ্গে অর্থনীতির চাহিদা ও সরবরাহের নীতি খাটে। সরবরাহ বেড়ে গেলে চাহিদা কমে যায়। একই পদবী ও ডিগ্রিধারী লোকজনের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমাজে তার আলাদা কদর থাকে না।
সাহিত্যিকদের গৃহীত পদবীগুলো কিভাবে চালু হয়েছে তা বলা মুশকিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখকের লেখার ধরণ অনুসারে লেখক নিজে কিংবা পাঠককুল তাঁকে একটি উপাধায় ডাকতে শুরু করেন। এটি সবচেয়ে বেশি হয়েছে কোনো সংগঠনের দ্বারা, সম্বর্ধনা কিংবা তার উপরের আলোচনার সূত্র ধরে উপাধিগুলো চালু হয়েছে। তাছাড়া মধ্যযুগে এসব নাম বা উপাধি রাজা বা জমিদাররা তাদের সভাকবিদের দিয়ে থাকতেন। যেমন বিদ্যাপতিকে বলা হতো মিথিলার কোকিল, ভারতচন্দ্রকে রায়গুণাকর। আবার মুকুন্দরাম হাতে-পায়ে কঙ্কন বাজিয়ে গাইতেন বলে তাঁকে বলা হতো কবি কঙ্কণ। মধ্যযুগের মালাধর বসুর উপাধি ছিল গুণরাজ খান, বাহারাম খান ছিলেন দৌলত উজির, রোসাংয়ের রাজদরবারে আলাওলকে মহাকবি বলা হতো। ইংরেজের শুরুতে কালিপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন হুতোম প্যাঁচা, ঈশ্বরগুপ্তকে বলা হতো যুগসন্ধিক্ষণের কবি। বঙ্কিম সাহিত্য সম্রাট, শরৎচন্দ্র অপরাজেয় কথাশিল্পী, প্রমথ চৌধুরী বীরবল নামে লিখতেন, সত্যেন্দ্রনাথকে বলা হতো ছন্দের জাদুকর, রবীন্দ্রনাথ বিহারীলাল চক্রবর্তীকে ভোরের পাখির খেতাব দিয়েছিলেন। মুন্সি আবদুল করিমকে সাহিত্য বিশারদ, নজিবর রহমানকে সাহিত্যরত, কাজী নজরুল ইসলাম একই সঙ্গে জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি, জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতির কবি, রূপসী বাংলার কবি, বনলতা সেনের কবি, তিমির হননের কবি, নির্জনতার কবি, জসীম উদ্দীন পল্লিকবি, কুমুদরঞ্জন মল্লিক পল্লিকবি, গোবিন্দচন্দ্র দাস স্বভাব কবি, মুকুন্দ দাস চারণকবি, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত দুঃখবাদী কবি। আরো অনেক কবির উপাধি রয়েছে, সব উল্লেখ করা বাতুলতা। আর ধর্ম প্রচারকদের জন্য তো তাদের বিদ্যালয় কেন্দ্রিক আলাদা উপাধি দিয়ে থাকে। এই সব পদবী না থাকলে তারা সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। যেমন অধিকাংশ মানুষই জানেন না, কিংবা জানার প্রয়োজনই বোধ করেন না, স্বামী বিবেকান্দের পিতৃপ্রদত্ত আসল নাম কি। নরেন্দ্র দত্ত কিভাবে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে উঠলেন সেটিই আসল কথা। স্বামী বিবেকান্দকে শৈশবে বীরেশ্বর বা বিলে, নরেন্দ্র বা নরেনও ডাকা হতো। এই সব নাম উপাধি গ্রহণের বহর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জগৎ -সংসারে আসলের চেয়ে মেকির দাম বেশি। সংসারের বন্ধনের সঙ্গে যুক্ত কারো নাম ধরে আমরা ডাকতে পারি না। মা-বাবার মতো সবচেয়ে নিকটজনের নাম ধরে ডাকাও সন্তানের পক্ষে ডাকা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় কাজে যুক্ত, ধর্ম প্রচারের সঙ্গ যুক্ত, শিক্ষা কাজের সঙ্গে যুক্ত- কারো নাম ধরে ডাকা অশ্লিষ্টতা। বিচারক, মন্ত্রী, পুলিশ- সবাইকে তাদের সাময়িক পদবী ধরে স্যার মহাশয় কিংবা মহামান্য বলাই বিধেয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নাম পোশাকের মতো একটি বানানো বস্তু। জন্মগ্রহণকালের পিতৃপ্রদত্ত নামটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নগ্ন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। নামবাচকতা এবং পোশাক মূলত সভ্যতাকে নির্মাণ করেছে। নাম বা উপাধি হলো অদৃশ্য ভাষার জগত আর পোশাক হলো দৃশ্যমান বস্তুও জগৎ- এই দুইয়ে মিলেই মানুষ।
এই সব উপাধি কি একজন কবি সাহিত্যেকের জন্য যথার্থ মূল্যায়ন হতে পারে? অবশ্যই না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই প্রকাশ তাদের বহুমুখী সৃষ্টিশীল প্রকাশকে ক্ষুদ্র বাতাবরনের মধ্যে দেখার পথ করে দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। অবশ্য পাশাপাশি উপাধার প্রতীকায়ন সাধারণে স্মরণ রাখার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে, পরিণামে এটি নামে পরিবর্তন হয়। আবার কালের পরিবর্তনের সঙ্গে একজন সৃজনশীল ব্যক্তির সৃষ্টিকর্ম নতুন নামে পরিচিত হতে চায়। যেমন ইদানীং লক্ষ্য করা যায়, অধিকাংশ নজরুল-পাঠক মনে করেন, ‘বিদ্রোহী’ কবি বলায় নজরুলের বহুমুখী সৃষ্টিশীল প্রতিভা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। এটিও আসলে ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে, কারণ আমাদের সমাজে বিদ্রোহকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয় না। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহকে যেভাবে দেখত, স্বাধীনতা-উত্তর সরকারগুলো প্রায় একইভাবে সমাজে বিদ্রোহীদের মূল্যায়ন করে থাকে। সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে যারা লড়াই করে তাদেরকেও দুষ্কৃতিকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এমনকি সাধারণ জনগণও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলা ভালো চোখে দেখে না। সাধারণ মানুষও ধর্ম সমাজ রাজনীতি- সকল কিছুকে প্রশ্ন করতে চায় না। এ ধরনের পরিস্থিতি উপস্থিত হলে তারা অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখী হয়। কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্তি¡কদের মতে ‘বিদ্রোহ’ একজন কবির অন্যতম সেরাগুণ। বিদ্রোহ ছাড়া নিজের মানুষ ও মাটির ঠিকমতো স্পর্শ পাওয়া যায় না। বিদ্রোহীহীন মানুষ ভেড়ার পালের মতো মুখ নিচু করে বেঁচে থাকে। এমনকি জাতীয় উপাধিতেও তাদের আপত্তি আছে, কারণ এসব ক্ষেত্রে জাতীয়তার ফল কায়েমি স্বার্থবাদি যেভাবে সংগ্রহ করতে পারে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। একজন বিদ্রোহী কবি যখন জাতীয় কবি হন, তখন বিদ্রোহী তার তেজ হারিয়ে ফেলেন। তার পক্ষে নিষ্পেষিত নির্যাতিত মানুষের জন্য কাজ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু সাধারণ মানুষ বিদ্রোহী কবির গান ভালোবাসেন, রোমান্টিক কবিতা ভালোবাসেন, ধর্মীয়-সঙ্গীত ও জীবনযাপন ভালোবাসেন -তারা কবিকে কেবল বিদ্রোহী উপাধার মধ্যে বন্দী দেখতে পছন্দ করেন না। তাদের জানা নেই, বিদ্রোহীর সঙ্গে এসব সত্তার কোনো বিরোধ নেই, রবং রোমান্টিক চেতনা ও বিদ্রোহী একই সত্তার ভিন্ন রূপ। তাই বলে শুধু কাজী নজরুল ইসলাম বললে পাঠকের মন ভরে না, তারা আদর করে কিছু একটা বলতে চান। অবশ্য সকল চাওয়াকে অতিক্রম করে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু নজরুল এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে শুধু রবীন্দ্রনাথ বলে যত ডাকা হয়, তাঁদের উপনামগুলো তার তুলনায় খুব গৌণ।
দু’একজন কবির ক্ষেত্রে তাদের উপনাম বেশ মানানসই ছিল, যেমন পল্লিকবি জসীম উদ্দীন। জসীম উদ্দীনের কালে পল্লিকবির উপাধা আরো কবির ছিল, যেমন , বন্দে আলী মিয়া ও ওমর আলীর জন্যও এ উপাধা খাটে। কিন্তু জসীম উদ্দীনের পল্লিকবির উপাধি যুতসই হলেও বিতর্ক সেখানেও ছিল। বলা হতো তিনি তো ছিলেন প্রকৃত বাংলার কবি তাহলে পল্লিকবি উপাধার মাধ্যমে আমরা তাঁকে খাটো করেছি কিনা। কারণ জসীম উদ্দীন নিজে যেমন ছিলেন নাগরিক রুচির মানুষ আবার তাঁর কাল ছিল নগরায়নের কাল, তিনি নিজে পল্লিতে বসবাস করেননি, তাহলে পল্লিকবি বলে পল্লির মানুষকেও বঞ্চিত করা হয়েছে কিনা। এই সব আলোচনা সমালোচনা বাদেও সবচেয়ে বড় বিষয় জসীম উদ্দীনের বিধৃত পল্লির অস্তিত্ব কি আজ কোথাও আছে। আজ জসীম উদ্দীনের কবিতা আদি বাংলার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। তাঁর কবিতা আর তাঁর কালের কবিতার মানুষের ভাষা ও জীবন-যাপনের আনন্দ ও গ্লানি এক সূত্রে গাথা হয়ে গেছে। আজ তাঁকে পল্লিকবি বলার মধ্যে কোনো বাড়তি সুবিধা নেই।
সাম্প্রতিক বাংলা ভাষার কবিদের ক্ষেত্রে আমরা একই সমস্যা দেখতে পাই, যেমন পঞ্চাশ দশকের কবি সৈয়দ শামসুল হক, যাকে সংক্ষেপে সৈয়দ হক বলা হতো- এই কবিকে সব্যসাচী বলে সম্বোধন করা হয়। সব্যসাচী মানে যার দুই হাত সমান চলে, বা দুই হাতে সমানভাবে শর-নিক্ষেপ করতে পারেন, মহাভারতে বর্ণিত অর্জুনকে বোঝানো হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন সৈয়দ হক কি দুই হাতে সমানভাবে শর-নিক্ষেপ করতে পারতেন, কিংবা অর্জুন যে কাজে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাঁর কাজের সঙ্গে একজন লেখকের সম্পর্ক কি। সম্পর্ক যাই হোক, আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, তিনি গদ্য-পদ্য সমানভাবে লিখতে পারতেন। জাতীয় নেতাদের উপাধি যেমন শেরে বাংলা, বাংলার বাঘ কিংবা মরুভূমির সিংহ হওয়া সত্তে¡ও তাদের শৌর্যবীর্য বুঝতে অসুবিধা হয় না, এ ক্ষেত্রেও দক্ষ তীরন্দাজ হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু থেকেই যায় সৈয়দ হকই বা এই উপাধিটা কিভাবে পেলেন। সৈয়দ হক একমাত্র লেখক নন যিনি কেবল গদ্যেপদ্যে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর আগেপরে অনেকে গদ্যেপদ্যে কম দক্ষ ছিলেন না, এমনকি তাঁর কালে বা অব্যবহিত পরে অনেকে গদ্যপদ্য সমান দক্ষতায় লিখতেন। এ উপাধি গ্রহণ করায় লেখক পরিচয়ের ক্ষেত্রে কেউ কেউ সুবিধা পেলেও, যারা করেননি তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে হয় না। উপাধি মূলত ব্যক্তির সমার্থক নাম ভিন্ন কিছু নয়। আমরা প্রায় ভুলেই যায়, একজন লেখকের লেখার বাইরে আলাদা কোনো নাম আছে কিনা। নামের লড়াইটা মূলত সমকালীন লেখকদের মধ্যে ক্ষমতার মনঃস্তত্ব ছাড়া কিছুই নয়। সৈয়দ হকের তুলনায় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ বা শহীদ কাদরীর উপাধি তত উজ্জ্বল নয়। কিন্তু কবি হিসাবে পাঠকের কাছে যে কোনো বিবেচনায় সব্যসাচী তাদের নিচের পঙ্ক্তিতে বসতে বাধ্য।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন- তাঁকে কেন জাতিসত্তার কবি বলা হয়’’


কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা সম্প্রতি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে আসীন হওয়ার পরে প্রচুর

অভিনন্দন
 এর পাশাপাশি কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন- তাঁকে কেন জাতিসত্তার কবি বলা হয়? কেউ কেউ আবার বলছেন, কে দিয়েছে সেটি পরিষ্কার করা হোক। আমার মনে হয়, আমি এতক্ষণ যে আলোচনা করেছি তাতে নিশ্চয় পরিষ্কার হয়েছে যে, সাহিত্যের উপাধি কে কাকে দিয়েছে, কে কিভাবে নিয়েছেন- সে প্রশ্ন একেবারে অবান্তর। কেননা উপাধি যারা দিয়েছেন, তাদের বৈধতা নিয়েই তো প্রশ্ন থেকে যায়। এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আগে পরে বা বর্তমানে অস্তিত্বশীল- যারা কবিরত, কবিতীর্থ, সাহিত্যরত, কবিশ্রেষ্ঠ উপাধি দিয়ে থাকেন। সেই সব উপাধি লেখকগণ বহনও করেন, কিন্তু তাদের অধিকাংশের আমরা নাম জানি না, বা সাহিত্যাঙ্গণেও তাদের কোনো উত্তমর্ণ নেই। কিন্তু নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের নাম আমরা কমবেশি সবাই জানি। তিনি যদি এ ধরনের সাহিত্যরত খেতাব নাও ধারণ করতেন তাহলেও পাঠক তাকে আনোয়ারা উপন্যাসের লেখক হিসাবে জানতেন। অন্যদিকে মুহম্মদ নূরুল হুদা ‘জাতিসত্তার কবি’ বা কবি নন- এ প্রশ্নটি বর্তমানে যারা উত্থাপন করছেন, তারা সম্ভবত তাঁর নতুন অবস্থানের ফলাফলের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন। কারণ এতদিন যাদের কাছে বিষয়টি অব্যক্ত ছিল, আকস্মিক এমন কি ঘটল, যার ফলে তা প্রকাশে তারা বাধ্য হচ্ছেন? হয়তো কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা তাদের কাছে গ্রাহ্য ছিলেন না, আর এখন যদি নতুন করে তাঁর গ্রাহ্যতা তৈরি হয়- সেটি তার বর্তমান পদের কারণে, কিছু লোকের ঈর্ষাও হয়তো একই কারণে। মুহম্মদ নূরুল হুদাকে মহাপরিচালক হওয়ার পরে কেন হাজার হাজার মানুষ
অভিনন্দন জানাচ্ছেন- এটিও তাদের কাছে একটি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ, আগে কারো ক্ষেত্রে যদি এতটা না হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে কেন হচ্ছে। এর সহজ জবাব, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর যাবৎ কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা সারা দেশে যেভাবে চারণের বেশে ঘুরেছেন- এ ক্ষেত্রে আর কেউ তার তুল্য নন। লেখেন অথচ নূরুল হুদাকে দেখেননি, তার সঙ্গে ছবি তুলেননি, এমন লেখক খুব কম পাওয়া যাবে। তাছাড়া বাংলা একাডেমি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নয় যে, অভিনন্দিত ব্যক্তিরা এই প্রতিষ্ঠান থেকে জীবদ্দশায় কোনো সুবিধা পেতে পারে, মৃত্যুর পরেও তাদের লাশ বাংলা একাডেমিতে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিরূপ আলোচকদের অনেকে বলছেন, বাংলা একাডেমির পুরস্কার একটা প্রেরণা হতে পারে। কিন্তু পুরস্কার পাবেন কিংবা পেতে চান এমন লেখকদের
অভিনন্দন

খুব কমই চোখে পড়েছে।

এবার আসি, মুহম্মদ নূরুল হুদা বর্তমান পদের যোগ্য কিনা। এই পদের জন্য সামাজিক যোগাযোগের বন্ধুরা এমন সব কবি-সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করেছেন- তাদের কেউ কবি হিসাবে খ্যাতিমান হলেও এই পদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার কারণে উপযুক্ত নন। কারণ বাংলা একাডেমি মূলত ভাষা শিক্ষা ও সাহিত্যের একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান, যেখানে মূলত একাডেমিক ব্যক্তিদের নিয়োগের কথা বলা আছে। এর ব্যতিক্রম করতে হলে আগে সংসদে বাংলা একাডেমির রেগুলেশন পরিবর্তনে আইন পাস করাতে হবে। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, কথাসাহিত্যিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক। যিনি ছাত্র জীবনে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। দীর্ঘদিন বাংলা একাডেমির পরিচালক পদ এবং নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশি বিদেশি অনেক গবেষণা জার্নালে তার একাধিক অভিসন্দর্ভ প্রকাশ ছাড়াও শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসহ একজন লেখক হিসাবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসাবে যে ধরনের নিয়োগ দান করা হয়, সেখানে মুহম্মদ নূরুল হুদার যোগ্যতার ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না। তিনি ছাড়া এই পদের আর কোন যোগ্যপ্রার্থী বঞ্চিত হয়েছে কিনা সেটি আলোচনার বিষয় হতে পারে।
এখন আসি জাতিসত্তার কবি প্রসঙ্গে, এ ব্যাপারে আমার আলাদা কোনো আগ্রহ নেই। একজন কবির উপাধি ধারণের ব্যাপারে আমার বক্তব্য আগেই পেশ করেছি। তবু সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে বলতে পারি মুহম্মদ নূরুল হুদা কেন জাতিসত্তার কবি? অধিকাংশ কবি সাধারণত তঁর প্রথম পর্যায়ের সফল কাব্যগ্রন্থের বিষয় কিংবা জনপ্রিয় কবিতার দ্বারা পাঠকের কাছে তার পরিচয় প্রকাশিত করে থাকে। তাঁর পাঠককুল কবির কাব্যের ভাবানুসারে তাকে সম্বোধিত করে থাকে। যেমন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখার কারণে নজরুল বিদ্রোহী কবি, মহাকাব্য লেখার কারণে মাইকেল, কায়কোবাদ প্রমুখ মহাকবি, রূপসী বাংলার কারণে জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলার কবি, আল মাহমুদকে সোনালী কাবিনের কবি- এ ধারার অসংখ্য উদাহরণ উপরে যুক্ত করেছি। আর এটিই দস্তুর বলে সাহিত্যাঙ্গণে প্রচলিত। সে ক্ষেত্রে জীবনের শুরুতে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা রচনা করেন ‘আমরা তামাটে জাতি’ নামে কাব্যগ্রন্থ, এরপরে রচনা করেন ‘জন্মজাতি’ কাব্যগ্রন্থ। এ ধারার অসংখ্য রচনা তাঁর রয়েছে। একটি জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এই কবিকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে বলেই এসব তাঁর কাব্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হতে পারে তিনি সচেতনভাবে জাতিসত্তার নৃতাত্ত্বিক উপাদানের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। আর সে ক্ষেত্রেও যদি তাঁর নামের সঙ্গে ‘জাতিসত্তার কবি’ শব্দবন্ধ প্রযুক্ত হয়, তাহলে এ ধারার অন্যদের থেকে ইতর বিশেষ হয় না। পল্লিমঙ্গলের কবি মোজাম্মেল হক, মাহফুজামঙ্গলের কবি মজিদ মাহমুদ, অন্নদামঙ্গলের কবি ভারতচন্দ্র, চন্ডীমঙ্গলের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্ত প্রত্যেকে আলাদা ব্যক্তি এবং প্রত্যেকে টিকে আছেন তাদের নিজ নিজ কাব্যপ্রতিভার গুণে- এতে অন্যদের গাত্রদাহের কারণ দেখি না! কেউ যদি মনে করেন মুহম্মদ নূরুল হুদার নামের সঙ্গে জাতিসত্তা যায় না, তাহলে তারা তাদের বা তাদের পছন্দের কবির সঙ্গে তা যুক্ত বা বিযুক্ত করতে পারেন। আর যদি তাদের মনে হয়, হুদাই বিরোধিতাই তাদের লক্ষ্য তাহলে তারা চালিয়ে গেলেই বা মন্দ কি!

(128)

মজিদ মাহমুদ জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতোকত্তোর। কবিতা তাঁর নিজস্ব ভুবন হলেও মননশীল গবেষণাকর্মে খ্যাতি রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪০ এর অধিক। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে,
কাব্যগ্রন্থ- মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), বল উপখ্যান (২০০০), আপেল কাহিনী (২০০১), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৫), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০০৯), গ্রামকুট (২০১৫), কাটাপড়া মানুষ (২০১৭), লঙ্কাবি যাত্রা (২০১৯), শুঁড়িখানার গান (২০১৯)।
প্রবন্ধ ও গবেষণা- নজরুল, তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০১), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৫), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৯), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১৩), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), সন্তকবীর শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), ক্ষণচিন্তা (২০১৬)।
গল্প-উপন্যাস- মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (১৯৮৬), সম্পর্ক (২০২০)। শিশু সাহিত্য- বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫), বাংলাদেশের মুখ (২০০৭)।