Home গদ্য বোবা কন্ঠের প্রতিধ্বনিত বিষ
বোবা কন্ঠের প্রতিধ্বনিত বিষ

বোবা কন্ঠের প্রতিধ্বনিত বিষ

24
0

আমি মরে গেছি এই কথা আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। হাঁটছি, খাচ্ছি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি তবু কি করে বিশ্বাস করবো যে আমার মৃত্যু হয়েছে? কিন্তু আমি বেঁচে আছি এটাও বিশ্বাস করতে পারছি না! মানুষ যেভাবে বেঁচে থাকে ঠিক সেরকমও আমি জীবন যাপন করছি না! গতকাল রাতেরই তো ঘটনা মা আমাকে কি সব বলছিল কিন্তু কথাগুলো শুনেও আমি বুঝতে পারছিলাম না। প্রচন্ড অভিমান নিয়ে তিন দিনের জন্য বান্দরবন ঘুরতে গিয়ে দেখি সেখানে অনেক স্মৃতি জমে আছে। সেসব স্মৃতি নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে এসে দেখি সবাই আমাকে ভুলে গেছে!

অদ্ভুত ভাবে অন্য কারোর ওপর তাদের মায়া প্রকট হয়েছে।
অভিমান নিয়ে প্রিয় বন্ধুর কাছে গেলাম কিন্তু গিয়ে দেখি অসংখ্য ভালো লাগা, অসংখ্য গল্প সে ভুলে গেছে! মাত্র তিন দিনে আমাদের এতো এতো স্মৃতি কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে। আঁকড়ে রাখবো না ভেবে যার সাথে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছিল তাকে দেখলাম, আরো অসংখ্যভাবে দেখলাম… বুঝলাম নিজের জায়গাটা সত্যিকার অর্থে নিজের থাকে না। অন্য কেউ এসে সে জায়গায় ঘর বানানোর চেষ্টা করে, চেয়ার টেনে বসে দিব্যি বন্ধনটা আরেকটু মজবুত করে! এসব কিছুই আমি করিনি হয়তো এসবের জন্যই তিন দিনেই সবার মন থেকে আমি বিতাড়িত হয়েছি।

নির্বাসিত জীবনকে ধরে রাখা হয়তো প্রথাগত ভুল।
তাকে দেখার জন্যই আবার বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি আমি ঠিক বেঁচে নেই!
কোথায় যাবো এখন? বর্তমান নিয়ে যে সিদ্ধান্তে আসতে পারে না তার দর্শন কি হতে পারে?

এসব ভাবতে ভাবতে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে হাঁটছিলাম। ভোরের বিস্তীর্ণ প্রভার ভেতর ত্রিদিপ্তাকে দেখতে পেলাম। কি অদ্ভুত প্রাণ নিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়! সবকিছু চমকে দেবার অস্বাভাবিক ক্ষমতা আছে এই মেয়েটার।

একই মায়ের পেট থেকে আমরা জন্মেছিলাম কিনা এটা নিয়েও আমার বেশ সন্দেহ আছে! তবে ত্রিদিপ্তা আর আমার মধ্যে একটা মিলই রয়েছে। আমরা চন্দ্রাহত হই। ইংরেজি লুনেটিক শব্দের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় পাগল, ক্ষিপ্ত, মানসিক রোগী। কিন্তু আমরা দু বোন ঠিক তেমনটা না। তবে ভরা জোছনা এলেই আমাদের সমুদ্রে আসতে হয়। আমরা দুইবোন সমুদ্রে এসে নির্জনতায় জেঁকে বসা সমুদ্রের গর্জন শুনি। আমরা এবারও সমুদ্রে এসেছি ভরা চাঁদ, ভরা জোছনার দেখার জন্য। কিন্তু আমার বারবার মনে হচ্ছে আমি মরে গেছি! ত্রিদিপ্তারও কি তাই ই মনে হচ্ছে? এই অদ্ভুত সুন্দর মানুষটাকে আমি কখনো দেখিনি নিজের কোন সমস্যার কথা কাউকে বলতে। একাই নিজের সমস্যা সমাধান করার অসাধারণ ক্ষমতাও তার আছে। মানুষ এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকে, অনেক অপূর্ণতা নিয়েই বেঁচে থাকে আর স্বপ্ন দেখে স্বাধীন হবার। আমি জানিনা মানুষ স্বাধীন হবার স্বপ্ন দেখে কিনা কিন্তু ত্রিদিপ্তার চোখে মুখে আমি দেখতে পাই স্বাধীন হবার প্রচন্ড আকাঙ্ক্ষা তাকে বাঁচিয়ে তোলে বারবার।

আমি এক চন্দ্রাহত অভাগা। মায়া কাটিয়ে উঠতে পারি না। যেখানেই যাই প্রচন্ড মায়ায় পড়ে মরে যেতে থাকি! তাই চাইলেও আমি ত্রিদিপ্তার মতো স্বাধীন হবার স্বপ্ন দেখতে পারি না! গভীর শূন্যতায় তার মতো খাপ খাওয়াতে পারি না। ভীষণ একা লাগলেই মনে হয় আমি মরে যাচ্ছি চাঁদের আলো আমাকে ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করছে…

(24)

জবা রায় ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় জন্ম ও বেড়ে উঠা এ তরুন কবি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়নরত।