Home কবিতা মারী ও মৃত্যু বিষয়ক পদাবলী
মারী ও মৃত্যু বিষয়ক পদাবলী

মারী ও মৃত্যু বিষয়ক পদাবলী

14
0

মারী

ক্লোরিনের ঘ্রাণমাখা এইসব মারীর সকালে
রাস্তাটা কাঁদছে
এমন নির্ভার বুকে কেউ কি কাঁদতে পারে!
ভারী-ভারী গাড়ি
ধুলোময় ব্যস্ততা
আর নিতম্বে টিউব পরে ঘসটে ঘসটে চলা সেই ভিক্ষুক!
কালপুরুষের মতো কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে সব
সমস্ত কোলাহল
এখন নীরব
শুধু
প্রচণ্ড হু হু শব্দে বোশেখি বাতাস
রাস্তাটার বুক ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে
যেন গোঁ গোঁ করে গুমরে কাঁদছে
ক্লোরিনের ঘ্রাণমাখা এইসব মারীর সকাল


ঘাম

গ্লাভসের ভিতর ঘেমে যাচ্ছে হাত
ভয়ের ভিতর ঘেমে যাচ্ছি আমি

চাকা বন্ধ― পা খোলা
ঘাট বন্ধ― স্রোত খোলা
জামাত বন্ধ― জমায়েত খোলা
মুখ বন্ধ― মৃত্যু খোলা

গ্লাভসের ভিতর ঘেমে যাচ্ছে হাত
ভয়ের ভিতর ঘেমে যাচ্ছি আমি
এইসব দেখতে দেখতে

তারপর

এই বৈশাখে এক বেভুল কোকিল
ঋতু ভুলে ডেকে ওঠে কুউ কুউ করে
ভাঁটফুল সেজে ওঠে লাল টোপরে
সাদামাটা ইফতারে রোজা ভাঙ্গে জনসাধারণ
কৃষকের ধান কাটে মাঠে নেমে সুন্দরীগণ
এইসব আপাতমধুর কিছু ছবি
কিছু সুর
দূর থেকে ভেসে আসা হাওয়ার মতন
মুছে দিয়ে যায় সব ঘাম
গ্লাভস আর মনের ভিতর


না-দেখা

আমি কোনও দিন জলার উপর ভেসে থাকা হিজলের ফুল দেখিনি

আমি কোনও দিন জলের উপর স্থির হয়ে থাকা নীরমহল দেখতে যাইনি সিপাহীজলা বেয়ে বেয়ে

আমি কোনও দিন কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় রোদ্দুর পড়ে সোনার মুকুট হওয়া দেখিনি

বীরের তরবারির প্রান্ত বেয়ে নামা খুন আর বাটে লেগে থাকা ঘাম আমি দেখিনি কখনও

আমি কোন রাজাকে শত্রুর পুত্রশোকে কাঁদতে দেখিনি

আমি কোন বেনিয়াকে খদ্দেরের লোকসানে আফসোস করতে দেখিনি

আমি কোন বেদের মেয়ে জোছনাকে কলসী কাঁখে জল তুলতে দেখিনি

মানুষের হৃদয় খুঁড়ে নিমের ফলের মতো থোকা থোকা দুঃখ দেখিনি কখনও

এমনতরো ছোটবড় অনেক না-দেখা কোঁচড়ে নিয়ে
হঠাৎ মরে গেলে
এইসব আফসোস মনে থাকে যদি
আর যদি কবরের ভিতর সেঁধিয়ে যেতে যেতে
আমি চিৎকার করে বলে উঠি
আমি কখনও দেখিনি কবরের ভেজা মাটিতে কিভাবে জন্মে বাসবলতা, গুল্ম, ঘাস আর কড়িফুল…
তুমি কি আমাকে সাথে নিয়ে সেইসব দেখবে না প্রভু?


আশ্চর্য কনট্রাস্ট

মুস্তাক ফুলের মত ধবধবে শাদা কিছু হাড়
মানুষের?
সবুজ শ্যাওলার বুক ভেদ করে ভেসে আছে
এক আশ্চর্য কনট্রাস্ট!
এক অনবদ্য শিল্প যেন-বা
হত্যা?
এখন দূরত্ব মাপা হয় অবিশ্বাসের ফিতেয়
মর্গে ও হাসপাতালে যদিও নৈকট্য খুব
লাশ?
ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ফেলে যাওয়া স্বজনের?
প্রতিদিন মস্তিষ্কে ঠুঁসে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যু
ঠুঁসতে ঠুঁসতে ফ্যাকাসে করে দেওয়া হবে
তারপর
মানুষ খুবলে খাবে মানুষের লাশ
জ্যান্ত মানুষের রক্ত চোষা শেষ হলে পরে
তখন
পথে প্রান্তরে অজস্র মুস্তাক ফুল ফুটবে
অন্ধকারে হায়েনারা জ্বলজ্বলে চোখে দেখবে
এক আশ্চর্য কনট্রাস্ট!


ম্যা

একপাল বন্ধুবৎসল ছাগল
খেয়ে ফেলছে পৃথিবীর তাবৎ আড্ডা
সম্পর্ক
মারী ও সুসময়
সবকিছুই সিজ্জিল হয়ে যাচ্ছে তাদের দাঁতের নিচে
চরে বেড়াচ্ছে
লাফাচ্ছে তিড়িং আর বিড়িং
কমিটি করছে
করছে নেতা নির্বাচন উনিশ দিন পর মৃত্যু জেনেও
অথচ মুখে ঠুঁয়া আঁটার পয়সা নেই কারুর
একপাল বন্ধুবৎসল ছাগল
মারী ও সুসময়
যখনই মুখ খুলছে
শব্দ হচ্ছে কেবল, ‘ম্যা’!


কোয়ারেন্টিন

চোখ মেলে ধরতে পারি না আমি বলে
হৃদয়ের অর্গল সবগুলো খুলে
কানপেতে বসে আছি আকুল আশায়
মনের বিরহী কূপে স্মৃতি উপচায়

জানালার জাফ্রিতে পলাতক আলো
ফেলে রাখা ছেঁড়াপাতা করে এলোমেলো
আলনাতে অগোছালো কতেক কাপড়
তোমার জন্য লাগে তাদেরও ফাপর

আমি তো অধম বটে যদিও মানুষ
জামার আড়ালে তবু আছে কিছু হুঁশ
সন্ধ্যাটা পড়ে এলে বাদমাগরিবে
তোমার দুয়ায় জানি আমাকেও নিবে

মারী ও মৃত্যু ঘেরা এমন সময়
চোখের আড়ালে বুঝি বাড়ছে প্রণয়
সুরে সুরে তেলাওয়াতে আর-রাহমান
মাবুদের কাছে চাবে আমার পরাণ

দয়িতারা বাড়িময় ছুটোছুটি শেষে
খুঁজবে আমার ঘ্রাণ তোমার পরশে
তাদের বোঝাবে কতো ছল কথা বলে
কার চোখ হবে বেশি জল-ছলছলে?

সব কিছু শেষ হয়, শেষ হয়ে যায়
ক্বিয়ামত শেষে লোকে আবার দাঁড়ায়
এই সব হাহাকার শেষ হলে পরে
আবার যুগল হবো ঘরে ও বাহিরে

(14)

সানোয়ার রাসেল জন্ম ১৯ জুলাই; ১৯৮৪।
পড়াশোনা: বিএসসি (অনার্স) ইন ফিশারিজ, মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
পেশা: সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (২৯ তম বিসিএস)।
কাব্য: তবুও বসন্ত, নিমগ্ন পঙ্ ক্তিমালা, ভাঁটফুল ও ভালোবাসার কাব্য, অন্ধ মুসাফির, বিষাদ তুমি অহেতু উস্কাও (ই-বুক)।
গল্পগ্রন্থ: প্রতিপ্রহরের গল্প, প্রায় সব চরিত্র কাল্পনিক।