Home গদ্য যাত্রাপালার সময় অসময় (পর্ব-১)
যাত্রাপালার সময় অসময় (পর্ব-১)

যাত্রাপালার সময় অসময় (পর্ব-১)

423
0

যাত্রালাপের শুরুতেই যাত্রা শব্দের উৎপত্তি সর্ম্পকে অনুসন্ধান করে দেখবো পালার সাথে কে বা কারা, কখন যাত্রা শব্দটি এঁটে দিয়েছিলো অবশ্য তার সঠিক হদিস মেলা বড় দায়। তবে অনেকেই কিছুটা ঠাহর করতে পেরেছিলেন যে, এই বাংলার অষ্টম ও নবম শতকে পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিলো। শ্রী চৈতন্যদেবের আবিভার্বের আগেও রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, পুণ্ড্র, চন্দ্রদ্বীপ হারিকেল, শ্রীহট্ট সহ এসব জায়গায় পালাগান ও কাহিনি কাব্যের অভিনয় প্রচলিত ছিল। এসব পালা ছিলো রামযাত্রা, কেষ্টযাত্রা, সীতার বারোমাসী, সম্ভবত এসব পালার ‘যাত্রা’ শব্দটি আলতো করে পালার সম্মুখে অজান্তেই এঁটে গেছে। সেই থেকেই ‘যাত্রাপালা’ শব্দটি অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে এখনও।

অন্যদিকে যাত্রা শব্দটির সাধারণ অর্থ হলো, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া বা গমন করা। সে ক্ষেত্রে আমরা দেখি বিভিন্ন যাত্রাদলগুলো ত্রিশ থেকে চল্লিশ জনের একটি বহর নিয়ে তারা দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালা গেয়ে বেড়ান, তাদের এই আরম্ভর বেড়িয়ে পড়া ধর্মীর অনুভূতিকে সামনে রেখে কল্যাণময় করতেই হয়তো পালার সাথে যাত্রা শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে। যাত্রাপালার উৎপত্তি সর্ম্পকে অকাট্ট দলিল কোথাও পাওয়া যাই নি বলে এ সর্ম্পকে বেশ ঠেলাঠেলি রয়ে গেছে।

যদি ব্যাকরণের ভাষায় যাত্রাকে দেখি, যাত্রা শব্দটির উদ্ভব হয়েছে সংস্কৃত ‘যা’ ধাতু থেকে, যার অর্থ গমন করা। ‘যাত্রা’ শব্দটি গমনার্থক। মহাশয় ডঃ সুকুমার সেন বলেছেন, ‘‘দেবতার শোভাযাত্রার থেকে যাত্রা শব্দটি এসেছে।’’ এই মতটিই অনেকেই শায় দিয়েছেন। ‘‘বাৎসরিক পূজা অথবা সাময়িক উৎসব উপলক্ষ্যে দেবতাকে রথে, শকটে অথবা শিবিকায় চড়াইয়া ভক্তেরা শোভাযাত্রা করিয়া নাটগীত করিতে এক স্থান হইতে অন্য স্থানে যাইত, এমনিভাবে পূন্যদিনে নদী স্নানেও লোকে যাইত। দেবতার শোভাযাত্রা হইতে আধুনিক ‘যাত্রা’ কথাটি আসিয়াছে ’’ ডঃ সুকুমার সেন বাঙ্গলা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ডে এমনটাই লিখেছেন।

ড. হংস নারায়ণ ভট্টাচার্য ‘যাত্রা’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করে যাত্রা শব্দটি গমনার্থক হিসেবেই বলেছেন। ডঃ অজিত কুমার ঘোষ ‘বাংলা নাটকের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘‘যাত্রা কথাটি অতি প্রাচীনকাল হইতেই চলিয়া আসিতেছে। অতীতে কোন দেবতার লীলা উপলক্ষে লোকেরা এক জায়গা হইতে অন্য আর এক জায়গা গমন করিয়া নাট গানের সঙ্গে সেই দেবতার মহাত্ম প্রকাশ করিত। ইহা যাত্রা নামে অভিহিত ছিল। সুতরাং যাত্রা বলতে উৎসব উপলক্ষে গমন এই ব্যাপারটি অপরিহার্য ছিল।”

যাত্রার উদ্ভব সম্বন্ধে আরও স্পষ্ট করে নগেন্দ্রনাথ বসু তার বিশ্বকোষ বইয়ে লিখেছেন, “শ্রীকৃষ্ণের রাস চক্রে গমনরুপ রাসযাত্রা নামে প্রসিদ্ধ। দোলযাত্রা, রথযাত্রা, গোষ্ঠযাত্রা প্রভৃতি দেবলীলার ঘটনাগুলি স্মৃতিপথে সমারূঢ় রাখিবার জন্য কতকগুলি লোক স্বেচ্ছা প্রণোদিত হইয়া এক এক স্থানে সমাগমন পূর্বক ব্যক্তি সাধারণের নিকট তদ্ব্যাপার প্রদশনার্থ একটি ধারাবাহিক চরিত্র চিত্র সমুপান্থিক করে। এই ব্যাপারই ক্রমে উৎসব বা যাত্রা নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে। যে দেব চরিত্রাংশ অতি গভীর পূজা আড়ম্বর ও ভক্তিসহ আনন্দ তরঙ্গ নাচগান বিমিশ্রিত হইয়া লোক সমারোহ প্রকচিত হয় তাহাই যাত্রা।”

যাত্রা সাধারণত গমনার্থেই ব্যবহৃত হচ্ছে, এ বিষয়ে অনেকে একমতে আসতে পারেন আবার নাও আসতে পারেন তবে এ আলাপটি এখানে রেখেই অন্য প্রসঙ্গে না গেলে সম্মানীত পাঠক ত্যাক্ত হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

এবার আসি যাত্রাপালার উৎপত্তির আলোচনায়। যাত্রাপালা অতিপ্রাচীন একটি ঐতিহ্য। অষ্টম ও নবম শতকে এ বাংলায় পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। সে সময় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি অভিপ্রায় করে দেখানো হতো। সেই থেকেই যাত্রার উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। আবার কোন কোন পণ্ডিত ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের সম্বাদসূক্তকে যাত্রাগানের আদি বলে মনে করেন। চর্যাগীতিতেও যাত্রাভিনয়ের বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয় বলে অনেকে অভিমত প্রকাশ করেছেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত জয়দেবের ‘‘গীতগোবিন্দ” কৃষ্ণ যাত্রার আদিরূপ বলে অধিকাংশ পণ্ডিত, তাদের মতামত প্রদান করেছেন।

খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় রচিত বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্যে যাত্রা গানের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এই আখ্যান কাব্যে উক্তি প্রতুক্তিমূলক সংলাপধর্মী গানের আশ্রয় গৃহীত হওয়ায় নাটকীয়তা ফুটে ওঠেছে। তবে ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্যদেবের হাতেই কৃষ্ণযাত্রা একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করে। তবে ষোড়শ শতাব্দিতে প্রথম দশকে আনুমানিক ১৫০৭-১৫০৮ খ্রিস্টাব্দ শ্রী চৈতন্যদের সপারিষদ চন্দ্রশেখরের গৃহে চরিত্রানুযায়ী সাজসজ্জা সহকারে সারারাত্রি ধরে কৃষ্ণলীলাভিনয় করেছিলেন। এই আসরী অভিনয়ে যাত্রাভিনয়ের আসরের সঙ্গে সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। এমনি করেই যাত্রার উৎপত্তি ঘটে বঙ্গদেশে।

অষ্টাদশ শতকে যাত্রা বাংলার ভূ-খণ্ডে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস ছিলেন যাত্রা জগতে বিখ্যাত, পরে উনবিংশ শতকে পৌরাণিক কাহিনি ভিত্তিক যাত্রা খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাদল প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। তখন কৃষ্ণলীলা এবং রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনি পাশাপাশি বিদ্যাসুন্দর, লাইলি মজনু, ইউসুফ জুলেখা, বেহুলা লখিন্দর, মা মনসা, লক্ষ্মীর মহিমা, কমলাবতীর রানী, এসব প্রেমকাহিনি ও লোকজ কাহিনির মধ্যে যাত্রাভিনয় সাধারণ মানুষের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

উনবিংশ শতকে পালাকার মতিলাল রায়কে আধুনিক যাত্রার জনক বলা হয়। কারণ তিনি তৎকালে প্রচলিত গীতাভিনয়ের মধ্যে নতুনত্ব আনয়ন করেন। নৃত্য, গীত, বাদ্য ও বক্তৃতা এ চার অঙ্গ নিয়েই মতিলালের যাত্রা সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে। উনবিংশ শতকের শেষে এবং বিশের শুরুতে যাত্রা মোড় ঘুরে আরও আধুনিক হয়। যাত্রায় শুরু হয় দেশপ্রেম মূলক কাহিনি। এই আধুনিক ধারার প্রর্বতক হিসেবে মুকুন্দ দাশকে ধরা হয়। তার প্রকৃত নাম যজ্ঞেশ্ব, তিনি বিক্রমপুর থেকেই বরিশাল গিয়ে দেশপ্রেমী ও বিল্পবী আশ্বিনী কুমারের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

মুকুন্দ দাশ যাত্রার মাধ্যমে দেশপ্রেম ও বৃটিশ বিরোধী বক্তব্য, পণপ্রথা, জাতিভেদ তৎকালীন সমাজের অসঙ্গতি গুলো তুলে ধরেন। তিনি স্বদেশী যাত্রার সূচনা করেন। এসব কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়। তার প্রেরণায় আরও অনেক স্বদেশি যাত্রার দল গড়ে ওঠে। তখন ঈশা খাঁ, প্রতাপচন্দ্র, বারো ভূঁইয়া, সোনাভান, সিরাজউদ্দৌলা, ক্ষুদিরাম এসব বিল্পবী চরিত্র এক এক করে যাত্রার চরিত্রে ওঠে আসে। আর এসব কারণে বৃটিশ সরকারের রোষানলে পড়তে হয় অনেককেই।

যাত্রার উদ্ভবকাল নিয়ে প্রভাতকুমার গোস্বামি বলেন, ‘‘ষোড়শ শতাব্দীতে যাত্রার বীজ বাংলার মাটিতে উপ্ত হয়েছিল তা অষ্টাদশ শতাব্দীতে অঙ্কুরিত হয় এবং উনবিংশ শতাব্দিতে তা নানা শাখা প্রশাখায় সমান্বিত বৃক্ষে পরিণত হয়।” প্রতিটি শিল্পই এরকম বৃক্ষের মতই অঙ্কুরিত হওয়ার পর একটু একটু করে আলোর সন্ধানী হয়, পরে শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে পরে চতুর্দিকে।

এ যাত্রালাপে ফাঁকে কিছু বইয়ের তথ্য দিয়ে রাখছি পড়ুয়াপাঠকদের জন্যে, যে বইগুলো যাত্রা শিল্প নিয়ে লেখা।

বইয়ের নাম

লেখক

৩০০ বছরের যাত্রার ইতিহাস গৌরঙ্গ প্রসাদ ঘোষ
যাত্রা পালার কথা পার্থ ঘোষ
লোকনাট্য মন্মনাথ রায়
যাত্রা: উত্থান ও পতন রীনা ভট্টাচার্য্য
যাত্রাগানে মতিলাল ও তার সম্প্রদায় ড. হংস নারায়ণ ভট্টাচার্য
যাত্রাগানের গোড়ার কথা ড. হংস নারায়ণ ভট্টাচার্য
বাংলার যাত্রাগানের উদ্ভব তপন বাগচী

ইচ্ছে হলে এই সকল লেখকের লেখাগুলি পড়ে যাত্রাশিল্প সর্ম্পকে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে খুব সমৃদ্ধ হতে পারেন।

 

(চলবে…………..)

(423)

মিহির হারুন জন্মঃ ১৫ মার্চ, ১৯৭০, মুক্তাগাছা, জেলা- ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ। লেখালেখি, শিক্ষকতা, নাটক আর আবৃত্তি সব মিলেমিশেই জীবন।
বইয়ের সংখ্যাঃ ২ টি (নাটক নিয়ে)
নাটকঃ ভিটা, বৈশাখী টেলিভিশন ও বিটিভিতে সম্প্রচার।
মঞ্চনাটকঃ হতলঙ্কা, শেকল ছেঁড়ার গান, মতির স্বপ্ন, পুতুল বিয়ে, খোকার গল্প ইত্যাদি।