Home গদ্য শরীর ও শহরের গল্প

শরীর ও শহরের গল্প

শরীর ও শহরের গল্প
146
0

দিশানের কালো গোলাপটি নগ্ন পড়ে আছে। সে নিজেও গা এলিয়ে শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে। ঠিক এ সময় জানালার ওপাশ দিয়ে পৃথিবীতে একটা ট্রেন চলে গেলো হুইসেল তুলে। মনে পড়লো বার্নার্দো বের্তোলুচ্চির ‘লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস’ সিনেমার কয়েকটি দৃশ্য। মুরাকামির একটা গল্পেও এমনটা ছিলো নাকি! মনে করতে পারছি না। জানালা গলে শেষ দুপুরের আলো পড়ছে দিশানের শরীরে। সোনারঙা শরীর। আমি ডানহাতের তর্জুনীতে একটু ছুঁয়ে দিলাম।

“কোন কোন দুপুরে দিশান আসে। হয়তো সাউন্ড সিস্টেমে তখন চৌরাশিয়া বাঁশিতে তুলছেন বৃন্দাবনী সারং”

কোন কোন দুপুরে দিশান আসে। হয়তো সাউন্ড সিস্টেমে তখন চৌরাশিয়া বাঁশিতে তুলছেন বৃন্দাবনী সারং। পৃথিবীর ঘুম চোখে নিয়ে সে আসে। আর নিয়ে আসে টাকিলা। কোনদিন হয়তো ডন জুলিও, কোনদিন তাপাতিও কিংবা পাতরন। অল্প পানেই দিশান ঝিম মেরে যায়। তাকে জিজ্ঞেস করি, জানো টাকিলা কী দিয়ে বানায়? চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকে সে। বলি আগাবে টাকিয়ালানা নামের এক প্রকার আনারস জাতীয় ফল থেকে। মেক্সিকোতে হয়। সে এইসব শোনে, কিন্তু শোনে না আদতে। আমাকে জড়িয়ে ধরে। ব্ল্যাক অপিয়ামের ঘ্রাণ পাই। তারপর মুচকি হেসে মুগ্ধ তাকিয়ে থাকে। তার চোখের মাঝে গহীন শূন্যতা।  দিশান এক গভীর সৌন্দর্যের সেতার। মোহগ্রস্ত হয়ে আমি তাকে বাজাতে থাকি আর বাজাতে থাকি।

দিশান বললো, যাই। আমি কিছুই বললাম না। আমার চিলেকোঠার জানালা দিয়ে দূরের আকাশ দেখা যায়। সন্ধ্যা নামছে তখন। আমি অবশ্য আকাশ দেখছিলাম না। ভাবছিলাম, দিশান কি বুড়োটার সঙ্গে গিয়ে আবার শুবে! খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, বুড়োটার সঙ্গে দিশান কীভাবে কি করে! আমি অবশ্য এসব বিষয়ে দিশানকে কিছু বলি না। তার কাছে কিছু জানতেও চাই না। শুধু মনে মনে এইসব ভাবি। দিশান চলে যাবার পরও দীর্ঘ সময় তার শরীর থেকে ব্ল্যাক অপিয়ামের সুঘ্রাণ বাতাসে ভাসতে থাকে।

দিশানের সঙ্গে আমার পরিচয়টা কাকতালীয়। অফিসে রাতের ডিউটি ছিলো, একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে চাকরি করি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে খবর কপি করে এনে কাটছাট করে, বাক্য ঘুরিয়ে, শব্দ পালটে নিজেদের নামে ছেড়ে দেই। নিজেদের পরিচয় দেই অবশ্য সাংবাদিক বলেই। আমাদের বেতনও অতি অল্প। সবচেয়ে নিচের গ্রেডের চেয়েও কম।  যাইহোক, রাতের ডিউটি শেষে ভোরে বাড়ি ফিরছিলাম উবারে করে। গাড়িতে চড়তেই চোখে পড়লো গাড়ির সিটের এক কোণে ছোট একটা রঙিন  হাত ব্যাগ। মেয়েদের। ড্রাইভারকে কিছুই বললাম না। যেন আমারই ব্যাগ, এমন ভাবে হাতে নিয়ে নিলাম। বাসায় ফিরে দেখি টাকায় ভর্তি। লাখ টাকার বান্ডেল, খুচরা হাজার পাঁচেক টাকা আর একটা সুইচড অফ ফোন। ব্যাগটা দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম কেউ ফেলে রেখে গেছে। লাখ খানেক টাকার লোভের সঙ্গে অনেকক্ষণ যুদ্ধ করলাম। তারপর ফোনটা অন করলাম। সারা সকাল কেউ ফোন করলো না। দুপুরে ফোন আসলো। একটা নারীকণ্ঠ জানালো, ফোনটা তার, এবং ফোনটা যে ব্যাগে ছিলো, সেই ব্যাগটাও টাকাসমেত তার। আমার ঠিকানা দিয়ে বললাম, ‘’উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে নিয়ে যান।’

দিশানের সঙ্গে আমার প্রেম হয়। না, আদতে আমিই দিশানের প্রেমে পড়ি। দিশান আমার প্রেমে পড়েছে কিনা বুঝতে পারি না। সে প্রথম আমার চিলেকোঠায় এসে মুগ্ধ হয়। চিলেকোঠা থেকে হাতিরঝিল দেখা যায়। মাথার উপর দিয়ে ভোঁ করে বিমান উড়ে যায়। আর যখন ট্রেন যায়, পাশের ট্রেনলাইন ধরে, ঝকাঝক ট্রেনের শব্দও মেলে। সে মুগ্ধ হয়ে বলে, ‘বাহ! আপনার চিলেকোঠাটা তো খুব সুন্দর! আমি আসবো কিন্তু প্রায়ই। আপনি সাধারণত কখন বাসায় থাকেন?’ এইভাবে দিশান আমার চিলেকোঠায় আসতে শুরু করে। আর আমার প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে ওঠে।

“সে, মানে দিশান, থাকে নিকেতনের একটি ফ্ল্যাটে। আমি কখনো যাইনি। সে মূলত বাচ্চু গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্টিজের চেয়ারম্যান বাচ্চু চৌধুরীর রক্ষিতা”

সে, মানে দিশান, থাকে নিকেতনের একটি ফ্ল্যাটে। আমি কখনো যাইনি। সে মূলত বাচ্চু গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্টিজের চেয়ারম্যান বাচ্চু চৌধুরীর রক্ষিতা। দিশানই বলেছে। তখন  আমি তার শরীরে। সে খিলখিল হেসে ওঠে, ‘কী ঘেন্না হচ্ছে?’ আমি বলি, না। ঠিক সে সময় একটা বিমান উড়ে যাচ্ছিলো। দুজনই নীরব হয়ে বিমান উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনছিলাম। সে বলে, মানুষের যখন অনেক টাকা হয়ে যায়, তখন সে প্রচুর অর্থ খরচ করে সেক্সের জন্য। তুমি যেটা ফ্রি পাচ্ছ, বাচ্চুর সেটার জন্য প্রতি মাসে খরচ হয় ৫ লাখ টাকা। এই বলে সে কিছুটা ম্লান হয়ে যায়। আমারও আঁতে লাগে। আমি বলতে চাই, শুধু আমি পাচ্ছি? তুমিও কি নিচ্ছ না আমায়? বলতে পারি না। তখন সে সহজ হওয়ার জন্যই বোধ করি বাচ্চুর গল্প বলে। বলে যে, বাচ্চু লোকটা উঠে আসছে একেবারে শূন্য থেকে। পড়াশোনা জানে না একটা লোক এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। গার্মেন্টস ব্যবসা দিয়ে শুরু। এখন তার নানান রকম ব্যবসা। ব্যাংক, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট, রিয়েল এস্টেট আরও নানান কিছু। আছে নিজস্ব পত্রিকা-টেলিভিশন। খবর-বাংলা চ্যানেলের মালিক বাচ্চু চৌধুরী শোনে আমি পুলকিত হই। মনে মনে আশান্বিত হই তাহলে দিশানকে ধরে খবর-বাংলা চ্যানেলে চাকরি নেয়া যাবে। আর ঠিক তখনই আমার মনে হয়, আমিও কি নিজের অজান্তেই বিনিয়োগ করছি নিজেকে?

সেই দিন দিশান আসে। তখন আমিও সবে ফিরেছি। ‘শহর উত্তাল বিক্ষোভে’ শিরোনামে নিউজটা সবচেয়ে বেশি রিডার্স পেয়েছে। একটা টেলিভিশনের রিপোর্ট থেকে কোন  কোন গার্মেন্টস কোম্পানিগুলো শ্রমিকদের শোষণ করছে তার একটা তালিকাও যুক্ত করে দিয়েছিলাম। বিভাগীয় সম্পাদক  অ্যাপ্রিশিয়েট করেছেন। বললাম, দিশানকে। ‘গার্মেন্টস কর্মীদের বিক্ষোভ?’ জানতে চাইলো সে। বললাম, হ্যাঁ। বেতন-ভাতাদীর দাবিতে ওদের বিক্ষোভের কথা শোননি? দিশান হাসলো। বললো, ‘এসব বিক্ষোভ-টিক্ষোভ থাকবে না। এই দেশে ধনীদের একটা ম্যাজিক আছে। সবকিছুই ওরা নিজেদের কোর্টে নিয়ে যেতে পারে। আর সরকারও মূলত ধনীদের পক্ষেই থাকে, যেহেতু, সরকার ভাবে, ধনীরাই তাদের বেশি বেশি কর-টর দিচ্ছে।’ আমি অবাক হই। বলি, এইসব তুমি ভাবো? সে হাসে। বলে যে, ‘না। আমার একটা প্রেমিক ছিলো, কবি। সে এইসব কথা বলতো। বলতো, ‘কখনো কখনো রাজাই সবচেয়ে পরাধীন এবং বন্দী। সে জানতেও পারে না, তার রাজ্যে কী ঘটে যাচ্ছে!’ দিশানের প্রেমিকের কথা শোনে আমার বুকের ভেতর কি ঈর্ষা জমে! কে জানে কেন কী এক গোপন ক্ষোভে ফেঁটে পড়তে ইচ্ছে করে।

দিশানের কথাই ঠিক হলো, আমার নিউজটা মুছে ফেলা হলো। বিভাগীয় সম্পাদক কড়া ভাষায় তিরস্কার করলেন। এই ধরনের নিউজ করার আগে অবশ্যই তাকে যেন জানিয়ে নিই। অথচ তাকে জানিয়েই নিউজটা করেছিলাম! মন খারাপ হলো খুব। রাগও। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এইসব নিউজপোর্টাল আমাদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিচ্ছে বটে। বেতন দিচ্ছে না।  গত মাসের বেতন এখনো পাইনি। দিনের দীর্ঘতম সময়, মেধা, শ্রম পানির মূল্যে বিকিয়ে দিচ্ছি। একটা ভালো চাকরি হলে!  দিশানকে ফোন দিলাম। ওর ফোন বন্ধ। এমনিতে স্যোশাল মিডিয়াতেও তার কোন অ্যাকাউন্ট নেই । চাকরিটা ছেড়ে দেবো ভাবছি। ওকে ধরে যদি কোনভাবে খবর-বাংলা চ্যানেলে ঢুকে পড়তে পারি একটা ভালো বেতনে, জীবনটা সহজ হয়ে যেতো। দিশান আসে তারপর দিন। তখন বিকাল হেলে পড়েছে সন্ধ্যার গায়ে। আমি ক্ষিপ্ত হই, জানতে চাই তার ফোন বন্ধ কেন? সে অবাক চোখে তাকায়। আমি শান্ত হয়ে তাকে বলি, তুমি আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দাও, দিশান, খবর-বাংলা চ্যানেলে। সে বলে, ওই চ্যানেলে কোন খবর যায় না। প্রকৃত কোন সাংবাদিক নেই। সাংবাদিকরা মন্ত্রীদের সঙ্গে সখ্য। শুধু নিজেদের পণ্যের বিজ্ঞাপন যায় আর সরকারের তাবেদারী করে নিজেদের ব্যবসার খাতিরে। উহারা পানির ন্যায় সরকারে সরকারে রঙ বদলায়। দীর্ঘদিন তারা বর্তমান সরকারের রঙে আছে। আমি শুনে রেগে যাই, আমি বলি, আমার কোন সমস্যা নাই, কে আছে আদর্শের জায়গায়? তুমি আছো? দিশান বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি কিছু বলি না। দূর থেকে ট্রেনের শব্দ শোনা যায়। ট্রেনটা ঢাকায় আসছে, না ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে কে জানে!

এরপর আর দিশান আসেনি। ফোন বন্ধ। যোগাযোগের আর কোন উপায় নেই। দুপুরগুলোতে তাকে খুব মিস করি। তখন রাগ হয় প্রচণ্ড। মনে মনে বলি, রক্ষিতা হয়ে শালি আসছিলো আদর্শ শেখাতে! তারপর হয়তো একটা বিমান উড়ে যায়। আমি চোখ বন্ধ করে বিমানের উড়ে যাওয়া কল্পনা করি।

(146)

কৃষ্ণ জলেশ্বর বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া একজন পৃথিবীবাসী। জীবনের কোন অর্থ খুঁজে না পেয়ে জীবন নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রাস্তার পাশে দেয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। কোন ব্যস্ত রাস্তার পাশে কখনোসখনো দেয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা একটি লোক নিশ্চয়ই আপনাদের চোখে পড়ে। সে-ই মূলত কৃষ্ণ জলেশ্বর। পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে জীবন দেখে।