Home বিশেষ সাঁওতাল সমাজ ও সংস্কৃতি
সাঁওতাল সমাজ ও সংস্কৃতি

সাঁওতাল সমাজ ও সংস্কৃতি

129
0

মুখমন্ডল গোলাকার, মোটা ঠোট, চ্যাপ্টা নাক, ফ্যাকাসে বর্ণ, কোঁকড়ানো চুল, মোটা পায়ের গোড়ালি, শক্ত চামড়া ও মাঝারি উচ্চতার জন্মগত শারীরিক গঠন নিয়ে বেড়ে ওঠেছে ওরা। এসব সাতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণেই অন্যদের কাছ থেকে তাদের আলাদা করা যায়। ওরা সাঁওতাল নৃ-গোষ্ঠী। রোগ, শোক অর্ধাহার, অনাহার তাদের জীবন সঙ্গী।  দিনাজপুর, নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এদের বসবাস  লক্ষ করা যায়। এছাড়া রংপুর, পাবনা, বগুড়া, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুসংখ্যক সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। অঞ্চলে বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত হিমালয়ের পাদভূমি প্রাকৃতিক বিপর্যয় মুক্ত হওয়ায় শান্তি প্রিয় এই জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলকে বসবাসের জন্য বেছে নেয়।  কঠোর পরিশ্রমী দৃঢ় মনোবল ও সংগ্রামী ভূমিকা নিয়ে বেড়ে ওঠেছে আদিকাল থেকে।  মিল-কারখানার কাজের পাশাপাশি দিনমজুরের কাজ করে থাকে। এদের অধিকাংশই শ্রমিক। পরিশ্রমী এবং সরল সহজ বলে মিল মালিক ও গ্রাম্য গৃহস্থদের কাছে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হয় এই জনগোষ্ঠী। বর্তমানে বাংলাদেশে সাঁওতালদের সংখ্যা প্রায় আড়াই লক্ষ। দিনাজপুর অঞ্চলেই প্রায় ৭০ হাজার সাঁওতাল রয়েছে।

সাঁওতালদের জীবনযাত্রা খুবই নিম্নমানের। নিত্য কষ্টে কাটে তাদের জীবন। তবে না খেয়ে থাকলেও ভিক্ষা করেনা ওরা। করেনা কাউকে বিরক্ত। শিকার করা তাদের প্রিয় স্বভাব। তীর ধনুক নিয়ে বনে জজ্ঞলে ঘুরে বেড়ায়। এক পরিসংখ্যানে  দেখা গেছে  এদের মধ্যে এমন পরিবারও আছে যাদের শুধুমাত্র অর্ধশতাংশ জমিই রয়েছে যাতে কোন রকম মাথা গুঁজে থাকা যায়। আবার কারো কারো কোন জমিই নেই। তারা অন্যের জমিতে বাস করে। তবে দু‘চারটি পরিবার মোটামুটি বিত্তবান এবং শিক্ষিত। তাদের কেউ কেউ চাকরিজীবি। প্রতি পরিবারে সদস্য সংখ্যা গড়ে ৫/৬ জন। মহিলাদের তুলনায় পুরুষের শতকরা হার বেশী। পরিবার পরিকল্পনার প্রতি বেশী আগ্রহী না হওয়ায় সাঁতালদের জন্মহার অধিক।

যেদিন কাজ না পায় সেদিন তাদের না খেয়েই দিন কাটাতে হয়। কারণ তারা অন্যের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কায় ঋণ গ্রহন করে না। এমনকি তারা ব্যাংক থেকেও কখনই কোন ঋণ গ্রহণ করে না। যদিও তারা কঠোর পরিশ্রমী তবুও তারা ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার কারণে অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা অর্থাভাবে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারছে না বলে জানা যায়। বর্তমানে  মিশনারীদের দ্বারা চালিত স্কুল ও হাসপাতাল থেকে তারা লেখাপড়া ও চিকিৎসার সুবিধা গ্রহণ করছে । তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে তাদের সন্তান-সন্ততিরা লেখাপড়ার সুযোগ পেলেও সরকারি হাসপাতালে তাদের ভিন্ন চোখে দেখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই তারা হাসপাতালে যেতে চায়না।পূর্বে তারা ঝাড়ফুকের মাধমে ওঝা দিযে চিকিৎসা নিত এবং কবিরাজী চিকিৎসা তাদের প্রিয়।  শিক্ষিতের হার খুবই কম, শতকরা প্রায় দুই ভাগ। তবে সরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করায় ইদানিং ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে।

ঘরবাড়ি বিচিত্র প্রকৃতির। প্রতিটি গৃহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকৃতির। ঘরের ছাউনি শন ও খড়ের। দেয়াল মাটির। ঘরের ছাউনি গোলাকার খাপকাটা, দরজা ১টি। মেয়েরা ঘরের দরজায় ও দেয়ালে বিভিন্ন আল্পনার ছবি আঁকে। বসার জন্য টুল, পিঁড়ি এবং দড়ির চেয়ার ব্যবহার করে থাকে। শয্যার জন্যও দড়ির খাট ও মাচা ব্যবহার করে। বিছানার চাদর হিসেবে ব্যবহার করে হাতে তৈরি খেজুর ও তাল পাতার চাটাই। পূর্বপুরুষ থেকেই তারা কুটির শিল্পে পারদর্শী। বর্তমানে তাদের কেউ কেউ কুটির শিল্পের পেশায় নিজেদের মনোনিবেশ করেছে।

বাংলাদেশের যে সমস্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে তাদের মধ্যে সাঁওতালদের জীবন যাত্রা কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম। অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী র সংস্কৃতিতে নানা মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও সাঁওতালদের জীবনযাত্রা ভিন্ন ধরনের। আদি নিবাস এবং উৎপত্তিলগ্নে এদের জীবনধারা যেভাবে সুষ্টি হয়েছিল আজকের বাংলাদেশেও তাদের জীবনধারা প্রায় সেরকমই রয়ে গেছে। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা নগণ্য হলেও তাদের প্রাচীন ভাষা ও ঐতিহ্যমন্ডিত সংস্কৃতি  সত্যিই গর্বের। ধর্মীয়ভাবে তারা চন্দ্র ও সূর্য পূঁজা করে। সূর্যকে প্রধান দেবতা হিসেবে মান্য করে, সেই দেবতার নাম সিং বোংগা।

সাঁওতালদের সাথে চীনা, বার্মিজ ও মালয়ীদের চেহারার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হলেও এরা এসব জাতিগোষ্ঠি থেকে একেবারেই আলাদা। অনেকের মতে সাঁওতাল পরগনার অদিবাসী বলে এদের নাম সাঁওতাল। নৃবিজ্ঞানী Skrefsrud এর মতে সাঁওতাল কথাটি সূতার থেকে (soonta) উদ্ভব হয়েছে। কারও কারও মতে এরা প্রাচীন আর্যদের অনেক আগে থেকেই এদেশে বসবাস করছে। এ ব্যাপারে William Hunter  বলেছেন, ‘‘সাঁওতালরা পূর্বাঞ্চল থেকে পূর্ববঙ্গে আগমন করে পশ্চিম দিকে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।’’ তবে পূর্বাঞ্চলের উৎপত্তি জানা যায় নি। নৃবিজ্ঞানীদের মতে সাঁওতালরা প্রাচীন আর্যদের অনেক আগে থেকেই এদেশে বসবাস করছে। তারা এ অঞ্চলের প্রাচীনতম অধিবাসী।  ১৭৯৮ সালের আগে থেকে তারা মেদিনীপুর এলাকায় বসবাস করে আসছে।

আধুনিক নৃতত্ত্ববিদগণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সিন্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এরা আদি অস্ট্রেলিয়ার মানবগোষ্ঠী। কারও ধারণা সাঁওতালরা ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল ৩০ হাজার বছর আগে। জনশ্রুতিতে অনুমিত হয় যে, এদের আদিমতম বসতি ছিল চয়েচম্পায়। এটা হাজারি বাগ মালভূমির উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত। জানা যায়, সাঁওতালরা অনেক আগে থেকেই ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে বসবাস করছিল। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে বিট্রিশ সরকার তাদের স্থায়ী বসবাসের জন্য দামনিকো এলাকায় একটি স্থান নির্দিষ্ট করে দেয় যা সাঁওতাল পরগনা নামে খ্যাত হয়। এখানে তারা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে থাকলেও পরগনায় হিন্দু মহাজনদের উদ্ভব ঘটে। ফলে, গরিব সাঁওতালরা তাদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারায়। একসময় দিনাজপুর অঞ্চলে প্রচুর অনাবাদী জমি ছিল। এসব আনাবাদী জমিতে চাষাবাদ এবং শ্রমিক হিসেবে কাজ করানোর জন্য সরকারের অনুমতি ক্রমে সাঁওতালদের দিনাজ পুরে আনা হয়। এক পর্যায়েতারা নাগরিকত্ব লাভ করে।

মহাজনদের চক্রান্তে সাঁওতালদের মধ্যে ক্রীতদাস প্রথার উদ্ভব ঘটে। অধিকাংশ সাঁওতাল ছিল হুকুমের তাঁবেদার। তাদের দেয়া হত সামান্য মজুরী ও একখন্ড কাপড়।  দৈনিক পরিশ্রমের যে পাওনা হত তা শুধু মহাজনদের ঋণ পরিশোধের খাতায় জমা পড়তোা কিন্তু প্রকৃত ঋণ পরিশোধ হত না। ফলে তাদের মৃত্যুর পর সন্তানদের উপর সেই ঋণের ভার অর্পিত হত। পরবর্তীকালে সাঁওতালরা  ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু, খ্রিষ্টান, কুঠিয়াল ও মাড়োয়ারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের চাপের মুখে তারা টিকতে পারে নি। সে সময় থেকেই সাঁওতাল জাতি অবহেলিত নিপীড়িত। সাঁওতালদের সৃষ্টিতত্তে¡র কাহিনী থেকে জানা যায়, তাদের আদি পিতা ‘পিলচুবুড়ীর’ সাত জোড়া ছেলেমেয়ে থেকেই সাঁওতালদের জন্ম। সে সময় থেকেই এদের গোত্র বিভক্ত হয়। মোট গোত্রের সংখ্যা ১২টি। হাঁসদাক, মরমু, কিসকু, হেমবরোম, মারনদী, সোরেন, টুডু, বাস্কে, বেসরা, পাঁওরিয়াও, চোড়ে ও বেদিয়া।

সাঁওতালদের সংস্কৃতি লক্ষ করলে দেখা যায়, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদে মহিলারা ব্লাউজ ও থামি পরিধান করে। বুকে ও পেটে এক টুকরো কাপড় জড়িয়ে নেয়। পুরুষেরা লুঙ্গি, কখনও বা নেংটি, সাথে গেঞ্জি পরে। সাঁওতাল জাতি হিন্দু ধর্মের আচারে মিশে গেলেও আদিম বৈশিষ্ট্যে এরা পৃথক ধর্মের অধিকারী। তবে বর্তমানে খ্রিষ্টান মিশনারীদের তৎপরতা ও আর্থিক সাহায্যের কারণে অনেকেই খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করছে। ফলে এদের নিজস্ব স্বকীয়তা অনেকাংশেই হারিয়ে যাচ্ছে। এদের উল্লেখযোগ্য পূজা-পার্বণঃ ফাল্গুন মাসে সালমেই, চৈত্র মাসে বোঙ্গাবুঙ্গি, জ্যৈষ্ঠ মাসে এরোবা সরদার, আষাঢ় মাসে হারিয়াও, ভাদ্র মাসে ছাতা, আশ্বিন মাসে দিবি, কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে নওয়াই এবং পৈাষ মাসে মোহরাই উল্লেখযোগ্য। তারা বৃষ্টির আহবানে রিনজা নাচের আয়োজন করে থাকে চরম উৎসাহে। এতে ছেলেমেয়ে সবাই নাচে। দাহার নৃত্য সাঁওতালদের বৈশিষ্ট্যময় নৃত্য। এই নাচ মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে এবং ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা রাতে হয়ে থাকে। তাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারার অন্য বৈশিষ্ট্য ঝুমুর নাচ। এই বিশেষ নাচ আদিম নৃত্য বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত বহন করে। পায়ে ঘুঙুর বেঁধে বিচিত্র তালের এই নাচ। এছাড়া তাদের বাচনভঙ্গিকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু সঙ্গীত গড়ে উঠেছে। লোকসঙ্গীত তাদের স্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিদর্শন।

সাঁওতাল সমাজে উৎসব অনুষ্ঠান মূলত দু‘প্রকার: জন্ম-বিবাহ-মুত্যৃকে কেন্দ্র করে উৎসব অনুষ্ঠান এবং পার্বণিক উৎসব অনুষ্ঠান। সাঁওতাল সমাজে বিয়ে সাধারণত চার প্রকারের: আমলি বিয়ে, সিঁদুর বাপলা, নিরবোলক টুংকিদিলিপ ও সোতা বাপলা বিয়ে। আমলি বিয়ে সম্ভ্রান্ত এবং শিক্ষিত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পনের বছরের মেয়ের সাথে উনিশ বছরের ছেলের বিয়ে হয়ে থাকে। স্বগোত্রের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। বিয়েতে পাত্র পক্ষ কনে পক্ষকে উপঢৌকন দেয়। অবিবাহিত ছেলেমেয়েরা মেলায় এবং হাটে তাদের প্রিয়জনদের অন্বেষণ করে জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব না দিলেও ব্যক্তিজীবনে বিয়ে ছাড়া ছেলেমেয়েরা তাদের জীবন অপূর্ণ বলে মনে করে।

কোন যুবক অপরিচিতি যুবতীর প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়লে যুবতী যদি তাকে পছন্দ না করে তখন যুবক কৌশলে মেয়ের কপালে সিঁদুর মাখিয়ে দিতে পারে। ফলে ঐ মেয়ে সহজে যুবকের বন্ধন এড়াতে পারে না। এতেও যদি যুবতী যুবককে পছন্দ না করে তবে বিচারে জরিমানা হয় ৫/- টাকা। একজন যুবতী যদি কোন যুবককে পছন্দ করে ফেলে তখন মেয়েটি ছেলের বাড়িতে গিয়ে পানীয় নিয়ে হাজির হয়। তবে সাঁওতাল সমাজে নারীর একটি বিশিষ্ট স্থান রয়েছে। সমাজে তালাক প্রথাও চালু আছে। তালাকপ্রাপ্তা মেয়েদের বলা হয় ছাডউই। সাধারণত তাদের মধ্যে চরিত্রহীনা মেয়েরাই তালাকপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। বিধবা নারী ও তালাকপ্রাপ্তদের দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক পাকাপোক্ত।

সাঁওতালরা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অন্তর্ভূক্ত। সাংস্কৃতিক জীবনধারাও বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত। এদের প্রত্যেকটি ব্রত অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জীবনসার বা আতœস্তু‘। তাদের জীবনসারের সঙ্গে ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়াও জড়িত। তারা ভূতপ্রেত বিশ্বাস করে। ভূতপ্রেতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পোষ্য প্রাণী, কবুতর, ছাগল, মুরগী উৎসর্গ করে থাকে। নবজাতকের জন্মের সময় প্রসূতির জন্য আলাদা কোন ঘর ব্যবহার করে না। নবজজ্তকের নারী কাটার জন্য তীর ধনুকের অগ্রভাগও লৌহ নির্মিত ধারালো অংশ ব্যবহার করা হয়। সাঁওতাল সমাজে অধিকাংশই কৃষিজীবি। তারা নারীকে উর্বরা শক্তির প্রতীক হিসেবে মনে করে। মেয়েরাও মাঠে কাজ করে। চাষাবাদের সময় এরা প্রত্যেকের কোমরে একটি সুতা বাঁধে। তাদের ধারনা এতে জমি উর্বর হয়। বীজ বোনার দিনে মেয়েরা   ক্ষেতে মিষ্টি নিয়ে যায় এবং কর্মরত পুরুষকে তা খেতে দেয়।

খাবারের মধ্যে ভাত প্রধান এবং ঢেঁকিছাটা চাল তাদের খুব পছন্দ। এছাড়া কাঁকড়া, শূকর, ইঁদুর, মুরগী, কাঠবিড়ালী, খরগোস, গো-সাপ, পাখি, লাল পিঁপড়া ইত্যাদি তাদের প্রিয় খাবার। গুড়ের মন্ডা, মনোহর বাতাসা, খাজা তাদের প্রিয়। তবে, কেউ ঘি খায় না। মেয়েরা ভাল পিঠা তৈরি করতে পারে। বেশ নক্সা এঁকে পিঠা তৈরি করে। তবে চিতাই পিঠা সবচেয়ে প্রিয়। পুরুষেরা গাঁজা, ভাং, বিড়ি, হুক্কা ইত্যাদি সেবন করে  থাকে। মদ তাদের সবচাইতে প্রিয় পানীয়।

সাঁওতালদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে এবং তা দুটি উপভাষায় বিভক্ত যেমন-কারমেলী ও মাহলেস। এদের মধ্যে দ্বিভাষিতা বিদ্যমান। তবে নিজস্ব ভাষা থাকলেও বর্ণ নেই, ধর্ম আছে কিন্তু ধর্মগ্রস্থ নেই। গবেষকদের মতে ধর্ম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অভাবের জন্য সাঁওতালদের কোন ধর্মগ্রস্থ নেই। মুত্যৃর পর এদের মৃতদেহ দাহ করা হয়। গ্রাম্য প্রধান ও আত্মীয়স্বজন মিলিত হয়ে তেল হলুদ মিশিয়ে মৃতদেহে মালিশ করে। এরপর গোবর ছিটিয়ে পবিত্র করে আগুনে দাহ করে। তারা পরজন্মে বিশ্বাসী। তাদের মতে আকাশে তাদের দেবতা মারাং বুড়ো ও অন্যান্যরা বাস করে এবং আকাশের শাস্তি বড় কঠিন। স্বর্গ-নরকে তারা বিশ্বাসী।

বাংলাদেশে যে সমস্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোক রয়েছে তাদের মধ্যে সাঁওতাল সম্প্রদায় তুলনামূলক ভাবে অনগ্রসরমান। তারা এখনও নিজেদের সম্পর্কে অনেক অসচেতন। জনসংখ্যা বৃদ্বির বিষয়টি পূর্বপুুষষদের মত এখনও তারা আমলে নিচ্ছেনা। জীবন যাত্রা ও আর্থিক ভাবে রয়েছে পিছিয়ে। দেখা যায় সকালে শিকারের সন্ধানে  বেরিয়ে ঘরে ফেরে সন্ধ্যায়। স্ত্রী সন্তানের প্রতিও উদাসীন। গরীব মানুষের মনোবল সব সময় দূর্বল থাকে । সেদিক বিবেচনায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরাও সবসময় মানষিক  ভাবে দূর্বল থাকে।  সম্প্রতি রাজশাহীর তানোরের সাঁওতাল জনপদে সহকর্মী মাহবুবুর রহমানকে নিয়ে বেড়াতে গিয়ে এসব নানা দৃশ্য চোখে পড়ে। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে সঠিক পথে আন্দোলিত করতে পারলে তারাও হয়ত একদিন পিছিয়ে থাকবেনা। পরিশ্রমী ও শক্তিপ্রবণ এই সম্প্রদায় এ দেশের সম্পদ। প্রাচীন এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়কে  শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানষিক সেবায় উন্নত করতে পারলে তারা হতে পারে আমাদের জনসম্পদ। তাই তাদের  প্রতি সত্যিকার সহযোগিতা মূলক দৃষ্টি প্রয়োজন সবার।

(129)

ড. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন গবেষক ও লেখক, আঞ্চলিক পরিচালক,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।